বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এনবিআরের সর্বশেষ তথ্যমতে, সারা দেশে এখন ১৫ হাজারের মতো করদাতা আছেন, যাঁদের ৩ কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ১৪ হাজার ৭০০ করদাতা সারচার্জ দিয়েছেন।

বাস্তবে তিন কোটি টাকার বেশি সম্পদশালী লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। অভিযোগ রয়েছে, অনেকে নিজের নামে সম্পদ দেখান না কিংবা বেনামে সম্পদ রাখেন। অর্থাৎ কর নথিতে তা প্রদর্শন করেন না। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, দেশের সব বড় বড় কোম্পানির পরিচালক বা মালিকেরা বৃহৎ করদাতা ইউনিটে (এলটিইউ) নিবন্ধিত। এনবিআরের বার্ষিক প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলটিইউর ৫২৪ জন করদাতা বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ২৯৮ জন বড় করদাতা সারচার্জ দিয়েছেন। অথচ এসব বড় কোম্পানির মালিকেরা বিলাসবহুল জীবন যাপন করেন। কিন্তু সারচার্জ এড়িয়ে যান।

রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো অভিজাত এলাকাগুলোতে বিলাসবহুল ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপনকারী প্রচুর লোক থাকেন। এসব এলাকায় তিন কোটি টাকার নিচে ফ্ল্যাটই মিলবে না। রাজধানীর সড়কে প্রতিনিয়ত বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, পোরশে, লেক্সাসের মতো বিভিন্ন নামীদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি দেখা যায়। কিন্তু ওই সব বাড়ি-গাড়ির মালিকদের অনেকেই সারচার্জ দেন না।

কেন সম্পদশালীদের কাছ থেকে সারচার্জ আদায় করা যাচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তরে এনবিআরের সদস্য (করনীতি) আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে জানান, করদাতা কত মূল্যে সম্পদ (বাড়ি-গাড়ি) কিনলেন, এর ওপর ভিত্তি করে সারচার্জ নির্ধারিত হয়। দলিলমূল্যটি কর নথিতে দেখানো হয়। ফলে ১০ বছর আগে সম্পদের যে মূল্য ছিল, ১০ বছর পর তার চেয়ে বেশি হবে। কিন্তু কর নথির তথ্যের ভিত্তিতেই সারচার্জ আরোপ হয়ে থাকে। আরেকটি কারণ হলো, এ দেশে সাধারণত প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে দলিল করা হয়। ফলে সম্পদের প্রকৃত মূল্যও কর নথিতে উঠে আসে না।

* ঢাকার মতিঝিল, পল্টন, শান্তিনগর, খিলগাঁও ও গোপীবাগে বেশি সম্পদশালী। * সবচেয়ে কম সম্পদশালী বরিশাল বিভাগে। * বড় কোম্পানির মালিকদের অনেকে সারচার্জ দেন না। * কর নথিতে দলিলমূল্য থাকায় সারচার্জ আদায়ে জটিলতা।

২০২০ সালের মে মাসে আর্থিক বিষয়ে পরামর্শ প্রদানকারী সংস্থা ওয়েলথ এক্স প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সম্পদধারীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ শীর্ষে। ওই সময়ে দেশে ৫০ লাখ ডলারের বেশি সম্পদধারী ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

কারা বেশি সারচার্জ দেয়

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর পল্টন, বিজয়নগর, ফকিরাপুল, মতিঝিলের ব্যাংক কলোনি, গোপীবাগ, জয়কালী মন্দির, অভয় দাস লেন, কমলাপুর, শান্তিনগর, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, বাসাবো প্রভৃতি এলাকার করদাতারা কর অঞ্চল ১৫-এ রিটার্ন জমা দেন। এ ছাড়া কয়েকটি সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এখানে আছেন।

কর অঞ্চল ১৫-এর পেছনেই আছেন কর অঞ্চল ১০-এর করদাতারা। সর্বশেষ হিসাবে, এই কর অঞ্চলে আট শতাধিক করদাতা সারচার্জ দেন। অবশ্য এই অঞ্চলে নিবন্ধিত রয়েছেন ২৫ হাজার চিকিৎসক। এ ছাড়া চট্টগ্রামের তিনটি কর অঞ্চলে প্রায় দুই হাজার করদাতা সারচার্জ দেন। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম করদাতা সারচার্জ দেন, যা সংখ্যায় মাত্র ৫৯।

সম্পদশালী বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ

২০১১-১২ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সারচার্জ দেওয়ার বিধান করা হয়। তখন অবশ্য দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে সারচার্জ দিতে হতো। গত ছয় বছরে এমন সম্পদধারী সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে মাত্র ৪ হাজার ৪৪৬ জন করদাতা রিটার্ন জমা দিয়ে মাত্র ৪৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা সারচার্জ দেন।

এরপর প্রতিবছর সারচার্জধারী সম্পদশালীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে সারচার্জ দেওয়া সম্পদশালীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সোয়া দুই কোটি টাকার বেশি (তখন সীমা ছিল সোয়া দুই কোটি টাকা) সম্পদধারী ছিল ১০ হাজার ৯৩১ জন। ওই বছর ২৫৪ কোটি টাকা সারচার্জ পেয়েছে এনবিআর। চার বছর পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে তিন কোটি টাকার বেশি সম্পদধারীর সংখ্যা ১৫ হাজার ছুঁই ছুঁই করছে। রাজস্ব আদায় সোয়া পাঁচ শ কোটি টাকা পেরিয়েছে।

দেশে যত লোকের তিন কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে, তাঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি রাজধানী ঢাকা ও আশপাশেই থাকেন। ঢাকা ও আশপাশের এ রকম প্রায় ৯ হাজার সম্পদশালী আছেন। দেশে ৬২ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী আছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র দশমিক ২৫ শতাংশ সারচার্জ দেন।

পাঁচ বছর আগে বাড়িওয়ালাদের ওপর একটি জরিপ করা হয়েছিল। ওই জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের প্রায় দেড় লাখ বাড়িমালিকের টিআইএন নেই, তাঁরা কোনো কর দেন না। অথচ ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে জমিসহ বাড়ির দাম কোটি টাকার বেশি। কিন্তু দলিলমূল্য কর নথিতে দেখানোর জটিলতার কারণে অনেক সম্পদশালী বিত্তবান করদাতাকে সারচার্জ দিতে হচ্ছে না।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন