বিজ্ঞাপন

অথচ করোনাভাইরাসের কবলে পড়ে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যে বিপদে রয়েছেন, তা বিভিন্ন গবেষণায় যেমন উঠে এসেছে, সরকারের শীর্ষ মহলেরও নজর এড়ায়নি। মোজারেলা চিজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এমিনেন্ট এগ্রি ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী নাজনীন কেয়া গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে আমার ৪২ শতাংশ জায়গার ওপর মাসে ৩ হাজার কেজি চিজ উৎপাদনের কারখানা। ঢাকায় বিপণন অফিস। করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চিজের চাহিদা আছে। কিন্তু অর্থের অভাবে উৎপাদন করতে পারছি না। আমার দরকার ছিল ৫০ লাখ টাকা। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। এনজিওর মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগে আশান্বিত হয়েছিলাম। আশা এখনো ছাড়িনি।’

এফআইডি সচিব যা বলেছিলেন

এফআইডি সচিব মো. আসাদুল ইসলাম ‘করোনাকালে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ভূমিকা’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে উদ্যোগটি সম্পর্কে বলেছিলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও উৎপাদকদের কাছে ঋণ পৌঁছানোটা জরুরি—এ কথা প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু ২০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তার বিতরণ পদ্ধতি ভালো না। ব্যাংকগুলোর অনীহা আছে। তা ছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঙ্গে এমএফআইগুলোর যোগাযোগটা ব্যাংকের চেয়েও ভালো।

ঠিক সিএমএসএমই নয়, তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে চলতি মূলধন দিতে গত বছরের ১৩ এপ্রিল থেকে অন্যান্য প্যাকেজের সঙ্গে ২০ হাজার কোটি টাকার যে প্যাকেজ শুরু হয়, সচিব আসাদুল ইসলাম এর কথাই বলছিলেন। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতির চিত্র জানতে যখন বহুপক্ষীয় সেমিনার করে অর্থ বিভাগ, তাতেও এমন পর্যবেক্ষণই উঠে আসে যে ক্ষুদ্ররা ঋণ পাচ্ছে না ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত এই তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ এখনো দেওয়া যায়নি।

এফআইডি সচিব আসাদুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় আমরা নীতিমালা করে দিয়েছি। তবে রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী এটা অর্থ বিভাগের করার কথা, তাই সেখানেই পাঠিয়েছি।’

শীর্ষ নির্দেশনাও উপেক্ষিত

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত বছর সিএমএসএমইর জন্য এনজিওদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণে একটি সারসংক্ষেপ পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। প্রধানমন্ত্রী তা অনুমোদন করেন। এরপর এফআইডিকে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করার নির্দেশনা দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ (এমআরএ) দেশের বড় কয়েকটি এমএফআইকে নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করে চূড়ান্ত খসড়া দাঁড় করায় এফআইডি, যা প্রথমে মন্ত্রিসভা ও পরে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেন। নাম দেওয়া হয় ‘নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রভাব মোকাবিলায় সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের দ্রুত ঋণ দেওয়ার সহায়ক নীতিমালা’। অথচ অর্থ বিভাগ এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে ৪৮ দিন ধরে তা ফেলে রেখেছে।

ঋণ মিলত ৪ শতাংশ সুদে

নীতিমালায় বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে টাকা দেবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেই টাকা ১ শতাংশ সুদে দেবে এনজিওগুলোকে। এনজিওগুলো পরে সেই টাকা ৪ শতাংশ সুদে গ্রাহকদের দেবে। তবে এনজিওগুলো সুদ পাবে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। একটা অংশ ভর্তুকি হিসেবে এনজিওগুলোকে দেবে সরকার। ঋণ দেওয়া হবে দুই বছরের জন্য। এ জন্য একটি এনজিও সর্বোচ্চ তিনটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে।

একক বা গ্রুপ—যেভাবেই হোক না কেন, এই প্যাকেজের আওতায় কোনো গ্রাহক ৫০ লাখ টাকার বেশি ঋণ পাবেন না। এর মধ্যে কুটিরশিল্প সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা, অতিক্ষুদ্র শিল্প সর্বোচ্চ ৩০ লাখ এবং ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবে। ঋণের টাকায় কোনো গ্রাহক তার আগে নেওয়া কোনো ঋণ সমন্বয় বা পরিশোধ করতে পারবেন না। গ্রাহক পর্যায়ে প্যাকেজের ৪০ শতাংশ ট্রেডিং খাতে এবং ৬০ শতাংশ উৎপাদন ও সেবা খাতে বিতরণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিবাচক

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালাটিকে মাঝখানে আরও গ্রাহকবান্ধব করে এফআইডিকে মতামত জানিয়েছে। সেই সঙ্গে নামও বদলে রেখেছে ‘করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতের জন্য পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচি’। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ঋণ পরিশোধের মেয়াদের মধ্যে ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডও থাকতে হবে। আর তহবিল দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এটি যেহেতু মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উদ্যোগ ছিল এবং ৯ মাসেও তা কার্যকর হলো না, পুরো বিষয়টি নিয়ে তাই গত সোমবার যোগাযোগ করা হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে ওই দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘কাজটি এখনো কেন হলো না, আমি খোঁজ নেব।’

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন