বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে ব্যবসার এই সুদিনের মধ্যেও দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আবাসন খাত। এক. রড-সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম ঊর্ধ্বমুখী। এক বছরের ব্যবধানে শুধু রডের দামই বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। দুই. রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ২০১৬-২০৩৫ সালের জন্য বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়ন করছে। সেটির আলোকে ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০২১ হচ্ছে। সেই খসড়া বাস্তবায়ন হলে ভবনের আয়তন বর্তমানে যা অনুমোদন হচ্ছে, তার চেয়ে ৩৩-৫৩ শতাংশ আয়তন হ্রাস পাবে।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, খসড়া ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়ন হলে ফ্ল্যাটের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি হিসাবে নিলে সেটি আড়াই গুণে দাঁড়াতে পারে। তেমনটি হলে মধ্যবিত্তরা ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন না। উচ্চবিত্তের জন্যও ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হবে। তাতে আবাসন খাত ধ্বংসের দাঁড় প্রান্তে চলে যাবে।

নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি

নির্মাণকাজের ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে। রডসহ নির্মাণসামগ্রীর দামও বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে রডের কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদকেরাও সমানতালে দেশে পণ্যটির দাম বাড়াচ্ছেন। অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দামও বেড়ে যাওয়ায় আবাসন ব্যবসায়ীরা ফ্ল্যাটের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে দাম বাড়িয়েছেও।

চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে এখন শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি ব্র্যান্ডের প্রতি টন রড ৭৭ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের এই সময়ে কোম্পানিভেদে প্রতি টন রড বিক্রি হয়েছিল সাড়ে ৫২ হাজার থেকে সাড়ে ৫৫ হাজার টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে রডের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।

দেশের শীর্ষস্থানীয় রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সব কটিই চট্টগ্রামে অবস্থিত। পরিবহন খরচের কারণে চট্টগ্রামের তুলনায় ঢাকায় রডের দাম প্রতি টনে অন্তত এক হাজার টাকা বেশি হয়। ফলে চট্টগ্রাম থেকে রড যত দূরত্বে যায়, দামও তত বেশি হয়।

বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম ৪০০-৪৫০ টাকা। চলতি বছরের শুরুর দিকেও প্রতি বস্তা সিমেন্ট বিক্রি হয়েছিল ৩৭০-৪২০ টাকায়। আট মাসে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ৩০ টাকার মতো।

সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের অন্যতম কাঁচামাল ক্লিংকারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। গত বছর প্রতি টন ক্লিংকারের মূল্য ছিল ৪৫ ডলার। গত মার্চে সেটি বেড়ে হয় ৫৫ ডলার। তখন দেশে সিমেন্টের দাম বাড়ানো হয়। জুলাইয়ে আবার ক্লিংকারের দাম টনপ্রতি ১০ ডলার বৃদ্ধি পায়। তাতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও সিমেন্টের দাম নতুন করে বাড়েনি। এ ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় কোম্পানিগুলোর উৎপাদনসক্ষমতা বেশি হওয়ায় দাম বাড়াতে একটু সময় নেয় কোম্পানিগুলো।

২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে আবাসন খাতের শক্ত অবস্থান গড়ে নিয়েছে ক্রিডেন্স হাউজিং। বর্তমানে ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের ৩০-৩২টি প্রকল্প চলমান। চলতি বছর নতুন ১৫টি আবাসন প্রকল্প করার জন্যও জমির মালিকের সঙ্গে চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

জানতে চাইলে ক্রিডেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জিল্লুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, গত এক বছরে ফ্ল্যাট বিক্রি ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে। রাজউক অনুমোদিত নতুন প্রকল্প আনলেই দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হিসাব করে দেখেছি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভবন নির্মাণের খরচ ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। প্রথমে ১০ শতাংশ, তারপর ২০ শতাংশ—এভাবে দাম বাড়াতে হবে। আর দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ফ্ল্যাটের চাহিদা কমবে।’

নতুন ড্যাপের বিধিনিষেধ

রাজধানীতে এখন ভবন নির্মাণ করা হয় ২০১০ সালের ড্যাপ ও ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসারে। ২০০৮ সালে করা এই বিধিমালায় জমির আয়তন অনুযায়ী কত তলা বা উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা যাবে, তা উল্লেখ আছে। এই বিধিমালায় বেশি উচ্চতার আবাসিক ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, ১৯৯৬ সালের বিধিমালায় ধানমন্ডির যে জমিতে ৬ তলা ভবন নির্মাণ করা যেত, ২০০৮ সালের বিধিমালায় সেখানে ১৪ তলা ভবন তৈরির সুযোগ দেওয়া হয়।

অবশ্য নতুন খসড়া ড্যাপে প্রস্তাব করা হয়েছে, গণপরিসর বা সাধারণ মানুষের জন্য জায়গা না ছাড়লে ব্যক্তি পর্যায়ে ধানমন্ডিতে ৮ তলার ওপর আর ভবন নির্মাণ করা যাবে না। নতুন ড্যাপে আবাসিক ভবনের উচ্চতাসংক্রান্ত প্রস্তাবটি শুধু ধানমন্ডি নয়, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ঢাকা শহরের সব এলাকার জন্য প্রযোজ্য হবে। আর রাজউকের আওতাধীন নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং সাভার পৌর এলাকায় আবাসিক ভবন হবে সর্বোচ্চ ৬ তলা।

খসড়া ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়ন হলে ফ্ল্যাটের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি হিসাবে নিলে সেটি আড়াই গুণে দাঁড়াবে। সেটি হলে মধ্যবিত্তরা ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন না।
আলমগীর শামসুল আলামিন, সভাপতি, রিহ্যাব

আবার ২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ২০ ফুট সড়কসংলগ্ন ৫ কাঠা জমিতে সর্বোচ্চ ৮ তলাবিশিষ্ট ভবনে মোট সাড়ে ১৩ হাজার বর্গফুট নির্মাণের অনুমতি মিলত। আর প্রস্তাবিত বিধিমালা বাস্তবায়িত হলে সমপরিমাণ জায়গায় নির্মাণ করা যাবে সর্বোচ্চ ৫ তলাবিশিষ্ট মোট ৯ হাজার বর্গফুটের ভবন। তবে ২০ ফুটের চেয়ে কম প্রশস্ত সড়কের ক্ষেত্রে ভবনের উচ্চতা ৩-৪ তলার বেশি হবে না।

আবাসন ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভবনের আয়তন কমলে জমির মালিক কিংবা আবাসন প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিত বা চাহিদা অনুযায়ী ফ্ল্যাট পাবে না। ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমে যাবে। কিন্তু জমির দাম কমবে না। ফলে ফ্ল্যাটের দাম হু হু করে বাড়বে।

নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভবন নির্মাণের খরচ ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। প্রথমে ১০ শতাংশ, তারপর ২০ শতাংশ—এভাবে দাম বাড়াতে হবে। আর দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ফ্ল্যাটের চাহিদা কমবে।
জিল্লুল করিম, এমডি, ক্রিডেন্স হাউজিং

এ বিষয়ে রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘খসড়া ড্যাপ বাস্তবায়ন হলে রাজধানীতে জমির পরিমাণ কমে যাবে। সে কারণে আমরা ধানমন্ডি, উত্তরা, গুলশান, নিকেতন, আফতাবনগরসহ যেসব পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় কমপক্ষে ২০ ফুট সড়ক আছে, সেখানে আগের ড্যাপের মতো ভবন নির্মাণের সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছি। অন্যথায় আবাসন খাতে ধস নামবে। সেই সঙ্গে আবাসন খাতের ওপর নির্ভরশীল ২৭০ উপখাত ও ৫০ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে।’

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন