default-image

করোনার প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই দেশে আবার লকডাউন শুরু হওয়ায় নতুন করে সংকটে পড়েছে আসবাব খাত। সাধারণ সময়ের তুলনায় ঈদে বিক্রি দ্বিগুণ হলেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সে আশা নেই। বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন চালালেও গতি কমিয়েছে।

আসবাব খাতের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি প্রকল্প ও করপোরেট ক্রয়াদেশের কারণে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। তা ছাড়া বড়রা গতবার সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ পেয়েছে। তারপরও বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে অধিকাংশ বড় প্রতিষ্ঠানেরই টিকে থাকা কঠিন হবে। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বেতন-ভাতা আর দোকান ভাড়া পরিশোধ করা নিয়েই ভয়াবহ সংকটে পড়ে যাবে।

রাজধানীর পান্থপথে গতকাল সোমবার বিকেল চারটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, লকডাউনের কারণে আসবাব মার্কেটের চিরচেনা ব্যস্ততা নেই। সারি সারি দোকানের প্রতিটির শাটার বন্ধ। দু-একটি দোকানের শাটার একটু খোলা। হঠাৎ কোনো ক্রেতা এলে বিক্রির আশায় আসবাব দেখাতে ভেতরে নিচ্ছেন বিক্রেতারা। আবার শাটার বন্ধ করে দিচ্ছেন, যাতে জরিমানা গুনতে না হয়।

সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও দেশের বাজারে ব্র্যান্ড ও নন–ব্র্যান্ড আসবাব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে নন–ব্র্যান্ডের সংখ্যাই বেশি। প্রায় চার দশক আগে ব্র্যান্ডের আসবাবের সঙ্গে দেশের মানুষকে প্রথম পরিচয় করান নিতুন কুন্ডু।
বিজ্ঞাপন

পান্থপথের একটি দোকানের ব্যবস্থাপক মো. সুলতান বললেন, ‘লকডাউনের কারণে আসবাবের বেচাবিক্রি পুরোপুরি বন্ধ। দোকানের মাসিক খরচই উঠবে না। দোকান ভাড়া ৬০ হাজার টাকা। আমিসহ চারজন কর্মী কাজ করি। মাস শেষে বেতন পাব কি না বা চাকরি আদৌ থাকবে কি না, সে বিষয়ে মালিকপক্ষ কিছুই বলছেন না।’

সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও দেশের বাজারে ব্র্যান্ড ও নন–ব্র্যান্ড আসবাব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে নন–ব্র্যান্ডের সংখ্যাই বেশি। প্রায় চার দশক আগে ব্র্যান্ডের আসবাবের সঙ্গে দেশের মানুষকে প্রথম পরিচয় করান নিতুন কুন্ডু। তাঁর হাতে গড়া অটবি দেশের পাশাপাশি ভারতেও সাড়া ফেলেছিল একসময়। অটবির পরে আসবাবের ব্র্যান্ডে যুক্ত হয় আখতার ও হাতিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘরবাড়ির পাশাপাশি অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মিত আসবাবের চাহিদা বাড়তে থাকে। এ চাহিদা কাজে লাগিয়ে নাভানা, পারটেক্স, ব্রাদার্স, নাদিয়া, হাইটেক, রিগ্যালের মতো নতুন নতুন ব্র্যান্ড হয়েছে। বর্তমানে সব মিলিয়ে আসবাবের ব্র্যান্ড আছে প্রায় ১৫টি।

বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির নেতারা জানান, ব্র্যান্ডের আসবাব সম্মিলিতভাবে বছরে দেড় হাজার কোটি থেকে দুই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। নন–ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানের বিক্রির হিসাব নিলে সেটি কয়েক গুণ বেশি হবে। খাতটির সঙ্গে জড়িত আছেন ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ।

চলমান লকডাউনে বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ থাকায় আসবাব উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ শতাংশ কমিয়েছে ব্রাদার্স ফার্নিচার। লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হলে উৎপাদন আরও কমানোর চিন্তাভাবনা করছে তারা।

বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইলিয়াস সরকার বলেন, ‘করোনার প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছানোর পর্যায়ে ছিলাম। আশা ছিল, আগামী জুনের মধ্যেই লোকসান কাটানো যাবে। তবে নতুন করে করোনা বেড়ে যাওয়ায় সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। লকডাউনে বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছি। তিনি বলেন, ‘লকডাউন কবে শেষ হবে, সেটি নিশ্চিত করে জানালে আমাদের পরিকল্পনা করতে সুবিধা হতো।’

বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির নেতারা জানান, ব্র্যান্ডের আসবাব সম্মিলিতভাবে বছরে দেড় হাজার কোটি থেকে দুই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। নন–ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানের বিক্রির হিসাব নিলে সেটি কয়েক গুণ বেশি হবে। খাতটির সঙ্গে জড়িত আছেন ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ।

রাজধানীতে আসবাবের বড় বাজার মিরপুরে। গতকাল দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, সব দোকান বন্ধ। পান্থপথের মতো সেখানকারও দু–একটি দোকানের শাটার অর্ধেক খোলা। একটি আসবাব দোকানের কর্মী ইমরান হাসান বলেন, ‘লকডাউনের আগে ব্যবসা মোটামুটি হচ্ছিল। লকডাউনে সব বন্ধ হয়ে গেছে। করোনায় গত বছর যখন দোকান বন্ধ ছিল, তখন অর্ধেক বেতন পাইছি। এবার বেতন পাব কি না, ঈদের আগে বোঝা যাবে।’

বিজ্ঞাপন
চলমান লকডাউনের ধাক্কা সামলে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকের জন্যই কঠিন হবে। কারণ, গতবারের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে সংকট এসেছে।
বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির চেয়ারম্যান সেলিম এইচ রহমান

তবে করোনার কারণে অনলাইনে আসবাব বিক্রি কিছুটা বেড়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে বিক্রি বাড়াতে প্রচুর বিনিয়োগ করছে। তারপরও মোট বিক্রির ১০ শতাংশও হচ্ছে না অনলাইনে।

দেশের বাজারে ও রপ্তানিতে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড হাতিল। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের মাসে সাধারণত দুই থেকে আড়াই মাসের বিক্রি হয়। তবে লকডাউনের কারণে সেই ব্যবসা আর পাওয়া যাবে না। ঈদের আগে লকডাউন শিথিল হলেও খুব বেশি ব্যবসার সম্ভাবনা নেই।

বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও আছেন সেলিম এইচ রহমান। বললেন, ‘চলমান লকডাউনের ধাক্কা সামলে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকের জন্যই কঠিন হবে। কারণ, গতবারের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে সংকট এসেছে। কর্মীদের নিয়ে কীভাবে টিকে থাকব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। সরকারের সহায়তা ছাড়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন