বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইএম৩ অ্যাগ্রি সার্ভিস কৃষকদের সঙ্গে কৃষি যন্ত্রের মালিকদের অনলাইনে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। কৃষকেরা কম খরচে সব ধরনের কৃষি যন্ত্রের সেবা নিতে পারেন। সেবার মানের নিশ্চয়তা দেয় ইএম৩ অ্যাগ্রি সার্ভিস। কৃষকেরা ঘণ্টা অথবা জমির পরিমাণের ভিত্তিতে যন্ত্র ভাড়া নেন। ইএম৩ অ্যাগ্রি সার্ভিসের অ্যাপের নাম ‘সমাধান’। প্রতিষ্ঠানটির সেবাগ্রহীতার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে। এত দিন শুধু জমি চাষ ও সেচে যন্ত্রের ব্যবহার বেশি ছিল, এখন রোপণ ও মাড়াইয়ে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে সমন্বিত মাড়াই যন্ত্র বা কম্বাইন হারভেস্টার, যা কৃষকের ফসল কেটে মাড়াই করে দিচ্ছে। কৃষি যন্ত্র কিনতে সরকার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। খুব শিগগির বাংলাদেশে ইএম৩-এর মতো কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

সব মিলিয়ে আগামী দশকটি হবে কৃষির যান্ত্রিকীকরণের। কৃষি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি, রোবটিকস, সেন্সর ইত্যাদি নানা প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু হয়েছে। এসব প্রযুক্তি কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, ব্যয় কমাবে, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে পণ্যের ভালো দাম নিশ্চিত করবে এবং কোন ফসল চাষ করলে লাভবান বেশি হওয়া যাবে, কোন ফসল কখন বিক্রি করতে হবে—এসব সম্পর্কেও ধারণা পাবেন কৃষক।

তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থা

ফসলের মাঠ থেকে মানুষের পাত—কৃষি পণ্যের পুরো সরবরাহব্যবস্থা হতে পারে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক। যেমন দেশের সুপারশপগুলো সরাসরি উৎপাদকদের সঙ্গে মুঠোফোন অ্যাপের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকতে পারে। আবার অন্যান্য খুচরা বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানসহ অন্যরাও গড়ে তুলতে পারে এই সরবরাহব্যবস্থা। এতে কৃষক তাঁর পণ্য একটি নির্দিষ্ট সংগ্রহকেন্দ্রে রেখে যাবেন। সেখান থেকে মান যাচাইকারী তা যাচাই করে নেবেন। যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্যামেরা, যা দ্রুত ফল বা সবজির মানে কোনো সমস্যা থাকলে ধরে ফেলতে পারবে। কৃষক মুঠোফোন অ্যাপে দাম পেয়ে যাবেন। ভারতে আইবনো নামের একটি স্টার্টআপ এভাবে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছে।

চাহিদা-জোগান জানতে তথ্যপ্রযুক্তি

আমরা জানি, বাংলাদেশের কৃষিতে কোনো কোনো বছর কিছু ফসল বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হয়। এতে দাম কমে যায়। ফলে পরের বছর কৃষক ফসলটি চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এতে উৎপাদন কমে গিয়ে দাম আবার বেড়ে যায়। এ সমস্যার সমাধান হতে পারে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। বীজ থেকে পাত বা সিড টু প্লেট ধারণাটি অনেক দেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে সয়েল সেন্সর, ইমেজিং ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি ব্যবহার করে চাহিদার প্রক্ষেপণ করে উৎপাদনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। এতে কৃষকেরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তথ্যপ্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ধরা যাক, এ বছর দেশে কত জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে, তা মৌসুমের শুরুতেই ‘ইমেজিং ড্রোন’ ব্যবহার করে সরকার জানতে পারল। দেখা গেল, চাহিদার চেয়ে উৎপাদন অনেক কম হতে পারে। তাহলে মৌসুমের শুরু থেকেই বিকল্প উপায় খুঁজতে পারবে সরকার। আবার উৎপাদন চাহিদার বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে রপ্তানির বাজার খোঁজাও যেতে পারে।

খামারে তথ্যপ্রযুক্তি

ইউটিউব ঘাঁটলেই দেখা যাবে, উন্নত খামারে গরুর গলায় একটি যন্ত্র ঝুলিয়ে দেওয়া আছে, যা আসলে সেন্সর। এতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। সম্ভব হয়েছে ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি প্রযুক্তির কারণে। এই যন্ত্র গরুর খামারিকে জানায় গরুগুলো কখন দুধ দেবে, কতটা দুধ পাওয়া সম্ভব, কখন গরুকে খাবার দেওয়া দরকার—এসব তথ্য। গরুর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি জানতে ব্যবহার করা যায় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেনটিফিকেশন (আরএফআইডি) প্রযুক্তি। দুধ সংগ্রহ, সরবরাহ, চাহিদা ও জোগান সম্পর্কে জানা—সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায় তথ্যপ্রযুক্তি।

মাছের খামারে মাছের চলাফেরা, খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা, পানির গুণাগুণ—এসব ক্ষেত্রে নানা প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও কিছু কিছু শুরু হয়েছে।

উল্লম্ব কৃষি ও সেচ

যেসব দেশে কৃষিজমি কম, সেখানে উল্লম্ব বা ভার্টিক্যাল কৃষি শুরু হয়েছে অনেক আগেই। এ পদ্ধতিতে আধুনিক মাচায় স্তরে স্তরে ফসল চাষ করা হয়। ব্যবহার করা হয় হাউড্রোপনিকস ও অ্যাকোয়াপনিকস প্রযুক্তি। বাংলাদেশে শহরে সীমিত পরিসরে এ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে।

সেচের জন্য ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ প্রযুক্তিতে গাছের গোড়ায় যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু পানি ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে কৃষকের পানি খরচ কমে। যেসব এলাকায় কৃষিতে পানির সংকট, সেখানে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কৃষিক্ষেত্রে এমন আরও অনেক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশ প্রয়োজন অনুযায়ী এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে।

কেন জরুরি

বাংলাদেশে আগামী তিন দশকে খাদ্যের চাহিদা বাড়বে ৮০ শতাংশ। বিপরীতে কমবে কৃষিজমি। কৃষকদের একটি প্রজন্ম প্রবীণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে। তরুণেরা কৃষিতে আগ্রহী নয়। এ অবস্থায় মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে কৃষির উৎপাদন বাড়াতে হবে, তরুণদের কৃষিতে আগ্রহী করে তুলতে হবে। এ দুই কাজে ডিজিটাল কৃষির বিকল্প নেই।

শ্রীলঙ্কায় সম্প্রতি খাদ্য আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে গেছে। বাংলাদেশে আমরা বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেখেছি, টাকা থাকলেও সংকটকালে বিশ্ববাজার থেকে খাদ্য আমদানি কতটা কঠিন। তাই নিজেদের খাদ্য আমাদের নিজেদের উৎপাদন করতে হবে। তাই উৎপাদন বাড়ানো ও কৃষিকে এগিয়ে নেওয়ার সব উপায় ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশে জমি চাষে পাওয়ার টিলার থেকে ট্রাক্টর প্রযুক্তিতে যেতে ২৫ বছর লেগেছে। কৃষির ডিজিটালাইজেশনে আমরা যেন দেরি না করে ফেলি।

কৃষি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব কৃষিবিদদের। কিন্তু ডিজিটাল কৃষি অনেকটা ইলেকট্রিক্যাল এবং কম্পিউটার প্রকৌশলীদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশের কৃষি খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

লেখক: কৃষি প্রকৌশলী ও নির্বাহী পরিচালক, এসিআই মোটরস

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন