default-image

দেশে এই করোনাকালে খাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প। এই খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ যেমন বেশি পেয়েছেন, তেমনি তাঁদের সুদও দিতে হয়েছে নামমাত্র। তিন দফায় সরকারের দেওয়া মোট ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণসুবিধার ৮০ শতাংশের বেশি পেয়েছেন তাঁরা। খাতটি আরও ঋণ চেয়েছিল, কিন্তু সরকার একপর্যায়ে ক্ষান্ত দিয়েছে।

জুলাইয়ের পর শ্রমিক–কর্মচারীদের মজুরি ও বেতনের জন্য নতুন করে ঋণ না পেয়ে এবার ভিন্ন ধরনের সুবিধা চাইছেন পোশাকশিল্পের মালিকেরা। এবারের চাওয়া ঋণ পরিশোধের লম্বা সময়। অর্থাৎ দুই বছরে যে ঋণ পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল, তা তাঁরা পাঁচ বছরে পরিশোধ করতে চান।

নতুন সুবিধা চেয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। টিপু মুনশি নিজেও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি। বাণিজ্যমন্ত্রীর ‘একান্ত সহযোগিতা’ ও ‘সদয় দৃষ্টি’ চেয়ে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক চিঠি দিয়েছেন ৯ সেপ্টেম্বর।

বিজ্ঞাপন
বিজিএমইএ চিঠিতে বলেছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বর্তমানে পোশাক খাত গভীর সংকটময় সময় পার করছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যে দৃশ্যমান।

বাণিজ্যমন্ত্রী সায় দিলেও এ সিদ্ধান্ত আসতে হবে মূলত অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মচারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘দুই বিঘা জমি’ থেকে একটি লাইন উদ্ধৃত করে বলেন, ‘এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি ...’।

বিজিএমইএ চিঠিতে বলেছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বর্তমানে পোশাক খাত গভীর সংকটময় সময় পার করছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। ক্রেতারা যেসব আদেশ দিচ্ছে এবং আগের ক্রয়াদেশের বিপরীতে যেসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, সেগুলোর অর্থ পেতে ৮ থেকে ৯ মাসের বেশি সময় লাগবে।

কোভিড-১৯ মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার এ পর্যন্ত ১ লাখ ১১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার মোট ২০টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রথম প্যাকেজটিই হচ্ছে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি ও বেতন দেওয়ার জন্য। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসের জন্য এ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয় গত ১ এপ্রিল। ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কারখানার মালিকেরা ঋণ নিয়ে বেতন-মজুরি দেন। কিন্তু জুন মাসের বেতন-মজুরি দেওয়ার আগেই টাকা শেষ হয়ে যায়। তখন তহবিলের আকার আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। এ টাকায়ও না কুলালে পরে আরও দেওয়া হয় ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে এ দফায় সুদের হার একটু বাড়িয়ে করা হয় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন
default-image

বিজিএমইএর পাশাপাশি বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) আরও ঋণ পাওয়ার চেষ্টা চালালেও সরকার আর আমলে নেয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পুরো তহবিল থেকে পোশাক খাত নিয়েছে ৮০ শতাংশের বেশি অর্থ। এসব ঋণের টাকা ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ দুই বছরে ১৮টি সমান কিস্তিতে ফেরত দেওয়ার কথা। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর চিঠিতে বলা হয়, ‘পোশাকশিল্পের এই সংকটকালে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করা দুরূহ ব্যাপার।’

জানতে চাইলে বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিজিএমইএর মতো আমরাও মনে করছি, এই চাওয়াটা ন্যায্য।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে গত মার্চে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল হয় ও স্থগিতাদেশ আসতে থাকে। এদিকে দেশেও ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর মাসখানেক কারখানা বন্ধ থাকে। তাতে এপ্রিলে পোশাক রপ্তানি কমে মাত্র ৩৭ কোটি ডলারে নেমে আসে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরের মাসে রপ্তানি হয় ১২৩ কোটি ডলারের পোশাক। জুনে সেটি বেড়ে ২২৫ কোটি, জুলাইয়ে ৩২৪ কোটি ও আগস্টে ২৪৬ কোটি ডলারে ওঠে।

বিজ্ঞাপন
প্রত্যাশার চেয়ে যেহেতু দ্রুততম সময়ে পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, ফলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার সামর্থ্য তাদের আছেই।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, সীমিত রাজস্ব সামর্থ্যের মধ্যেও সরকার পোশাক খাতের জন্য অনেক উদারতা দেখিয়েছে। যেমন বাজেটের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্যাকেজ দিয়েও পাশে দাঁড়িয়েছে। আবার এ খাতের জন্য ঋণের পরিমাণ যেমন বেশি, সুদের হারও কম। সব মিলিয়ে বিবেচনা করলে যেকোনো খাতের তুলনায় পোশাক খাত বেশি সুবিধাই ভোগ করেছে। পোশাক খাতের জন্য ঋণ পরিশোধের সময় পাঁচ বছর করা হলে এসএমই ও সেবা খাতের মতো অন্য যেসব খাত আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করা হবে না।

গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, প্রত্যাশার চেয়ে যেহেতু দ্রুততম সময়ে পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, ফলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার সামর্থ্য তাদের আছেই। সময় না বাড়ানো হলে এই টাকা ব্যাংক খাতে ফিরে আসবে, ব্যাংক খাত তখন দরকারি অন্য খাতে ঋণ দিতে পারবে।

এ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে গতকাল মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করেও কথা বলা যায়নি। তবে বাণিজ্যসচিব মো. জাফর উদ্দীন জানান, চিঠির কথা তাঁর জানা নেই। এ ধরনের ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমেই সুপারিশ করা হয়।

মন্তব্য পড়ুন 0