তৈরি পোশাক ও সিরামিক
গ্যাসের সংকটে শঙ্কিত দুই শিল্পের উদ্যোক্তারা
কয়েক মাস ধরেই গ্যাসের সংকট চলছে। গত রোববার বিবিয়ানার কারণে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
গাজীপুরের হোতাপাড়ায় ফার সিরামিকের কারখানায় গত ৪-৫ দিন ধরে গ্যাস নেই। দিন–রাত কোনো সময়ই গ্যাস না থাকায় কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। এ সময় দিনে সিরামিকের ৪০ হাজার পিস তৈজসপত্র উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল তাদের। গ্যাস–সংকটে সেটি করতে না পারায় প্রতিদিন ৩০ লাখ টাকা করে লোকসান হয়েছে কারখানাটির।
ফার সিরামিকের পরিচালক ইরফান উদ্দিন বলেন, ‘গত মাসের প্রায় ২৫ দিন দিনের বেলায় গ্যাস পাইনি। সন্ধ্যার পর গ্যাস আসত। সকাল পর্যন্ত থাকত। তবে গত ৪-৫ দিন ধরে দিন-রাত কোনো সময়ই গ্যাস পাচ্ছি না। রোজার পরই ঈদ আসছে। এ সময়ে গ্যাস–সংকটের কারণে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন না করতে পারলে ঈদের আগে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
ফার সিরামিকের মতো গাজীপুর, ময়মনসিংহ, আশুলিয়া ও সাভার এবং নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের সিরামিক কারখানা গ্যাস–সংকটে বেশি ভুগছে। একই কারণে রপ্তানিমুখী বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদনও ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক কারখানা নির্ধারিত সময়ে পোশাক প্রস্তুত করে জাহাজীকরণ করতে পারছে না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত ডিসেম্বরের শুরু থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি হ্রাস পায়। আবার গ্যাসের চাপ কমে আসায় বিবিয়ানায় সংস্কারকাজ শুরু করে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। এ জন্য মাস তিনেক ধরে মাওনা, কোনাবাড়ীসহ গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা, সাভার-আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের শিল্পকারখানায় গ্যাস–সংকট ছিল। বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের সঙ্গে হঠাৎ বালু উঠে আসায় গত রোববার সেখানকার ছয়টি কূপের উৎপাদন বন্ধ করা হয়। এরপরই গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার নেয়।
নারায়ণগঞ্জ বিসিকে এমএস ডায়িং কারখানায় প্রতিদিন ৭০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে গত ১০ থেকে ১৫ দিন গ্যাসের সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন অর্ধেকের কম হচ্ছে। রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যায়। এ সময়ে ২০-৩০ টনের বেশি কাপড় রং করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই প্রতিদিন কারখানাটিকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে জানান নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
মোহাম্মদ হাতেম নিজের এমবি নিট ফ্যাশন কারখানার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘চলতি মাসে আমাদের ২৫ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে গ্যাস–সংকটের কারণে চাহিদামতো কাপড় পাচ্ছি না। ফলে চলতি মাসে ১৫ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করা যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ নিট কারখানাই গ্যাস সংকটে ভুগছে। পণ্য রপ্তানি না করতে পারলে ঈদের আগে কোনো কারখানাই বেতন–ভাতা দিতে পারবে না।
বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। করোনার মধ্যেও খাতটি বেশ ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে কারখানাগুলোতে প্রচুর ক্রয়াদেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ৩ হাজার ১৪৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৩ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি।
বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান প্রথম আলোকে বলেন, পোশাকের ক্রয়াদেশ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তবে গ্যাস–সংকট নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। গ্যাস–সংকটের কারণে পোশাক উৎপাদনে আমরা ইতিমধ্যে পিছিয়ে গেছি।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে গ্যাস–সংকটে ভুগছে কারখানাগুলো। আমরাও সমস্যা তুলে ধরেছিলাম। সে অনুযায়ী তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না।’