বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে দিঘি প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের রপ্তানি পণ্যের যে তালিকা দিয়েছে তাতে ‘এ–ফোর’ কাগজের কথা নেই; বরং মঙ্গলবার বাংলায় লেখা যে ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়েছে হুবহু একই নমুনা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ছিল। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পরদিন বৃহস্পতিবার ওয়েবসাইট থেকে নমুনা সরিয়ে নেওয়া হয়। চীনের প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে মোট কয়টি চালান রপ্তানি করেছে সেই তথ্য চেয়ে তাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া ই-মেইলে গতকাল শুক্রবার সকালে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। তবে তারা কোনো উত্তর দেয়নি।

বাংলাদেশে বিড়ি-সিগারেটের প্যাকেটে কাগজের যে ছোট পাতলা আবরণ ফিতার মতো জড়ানো থাকে, সেটি হলো ব্যান্ডরোল। ব্যান্ডরোল ছাপে সরকারি প্রতিষ্ঠান দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ। সেখান থেকে তা সংগ্রহ করে সিগারেটের কোম্পানিগুলো। আর বাজারজাতের সময় ব্যান্ডরোলের ব্যবহার অনুযায়ী ভ্যাট বিভাগে শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ সিগারেটের কর আদায় হয় এই ব্যান্ডরোলের মাধ্যমে।

খালাস হওয়া ১৩ চালান গত এক বছরে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়। কাস্টমসের তথ্যে দেখা যায়, দিঘি এন্টি ফেইক কোম্পানি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রথম চালান আমদানি হয় গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর। চট্টগ্রামের জুবিলী রোডের আরাফাত এন্টারপ্রাইজ এই পণ্য আমদানি করে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ছয়টি চালান খালাস করে নিয়েছে। সর্বশেষ চালান খালাস হয় গত ৩ আগস্ট। মঙ্গলবারের চালানটি জব্দ হওয়ার হওয়ার আগে আন্দরকিল্লার বাপ্পু এন্টারপ্রাইজ সাতটি চালান খালাস করে নিয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানেরও পণ্য খালাসে নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ ছিল মধুমতি অ্যাসোসিয়েটস।

সিগারেটের প্যাকেট বাজারজাত করার সময় জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
মইনুল খান, কমিশনার, ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগ

মধুমতি অ্যাসোসিয়েটসের প্রতিনিধি বাহারুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানিকারক যে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনছেন, তা আমাদের জানা ছিল না। এ ব্যাপারে জানতে বাপ্পু এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার বাপ্পু বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।’

কাস্টমস জানায়, খালাস হওয়া ১৩টি চালানে পণ্যের পরিমাণ ছিল ১৯৮ টন। মঙ্গলবার মাত্র ২ দশমিক ৩০ টন ওজনের ব্যান্ডরোল হিসাব করে পাওয়া গেছে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজারটি। এ হিসাবে খালাস হওয়া চালানে ২৭৪ কোটি পিস ব্যান্ডরোল থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কাস্টমসের জব্দ হওয়া ও ব্যান্ডরোল নিম্নস্তরের ১০ শলাকাবিশিষ্ট সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহার উপযোগী। এই স্তরের সিগারেটের খুচরা মূল্য ৩৯ থেকে ৬২ টাকা। এই মূল্যের বিপরীতে সম্পূরক শুল্ক ৫৭ শতাংশ ও মূসকের ১৫ শতাংশ রাজস্ব হিসেবে আদায় করে ভ্যাট বিভাগ।

খালাস হওয়া চালান কেন ধরা পড়ল না—এমন প্রশ্নে কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, গড়ে প্রতিদিন সাত হাজার চালান খালাস হয়। এর মধ্যে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৫ শতাংশ এবং গোপন সংবাদ বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় সন্দেহজনক কনটেইনার খুলে সরেজমিন পরীক্ষা করে খালাস দেওয়া হয়। এর বাইরে সব পণ্য পরীক্ষা করা যেমন অসম্ভব, তেমনি ব্যবসাবান্ধবও নয়।

মঙ্গলবারের চালানটি কীভাবে শনাক্ত করা হলো জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপকমিশনার মো. সালাহউদ্দিন রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, জাতিসংঘের মাদকবিরোধী সংস্থা অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমের (ইউএনওডিসি) সহায়তায় কাস্টম হাউসে স্থাপিত পোর্ট কন্ট্রোল ইউনিট থেকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় চালানটি শনাক্ত করা হয়েছে।

চালান জব্দের ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার বন্দর থানায় ফৌজদারি মামলা করেছেন। ওই মামলায় বাপ্পু এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার বাপ্পু বড়ুয়াসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে ১৩টি চালান আগে খালাস হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা হওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবির।

সিগারেট থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করে এনবিআর। ২০২০–২১ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। সন্দেহজনক চালান বেরিয়ে যাওয়ায় তা সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহার নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। অবশ্য খালাস হওয়া চালানের বিপুল পরিমাণ জাল ব্যান্ডরোল কম সময়ে ব্যবহার হওয়ার কথা নয় বলে ধারণা কাস্টমস কর্মকর্তাদের।

জানতে চাইলে ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগের কমিশনার মইনুল খান প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নেপথ্যে কারা আছে, তা খুঁজে বের করার নির্দেশনা দিয়েছে। সিগারেটের প্যাকেট বাজারজাত করার সময় জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করতে অভিযান চালানো হচ্ছে।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন