default-image

ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেখে দেখে অনেক ভেজাল জমি কিনেছে বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি। জমি কেনার জন্য কোম্পানি থেকে টাকা বের হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেক জমির নিবন্ধনই হয়নি।

২০০০ সালে লাইসেন্স পাওয়া এই বিমা কোম্পানি সরকারি সিকিউরিটিজ বিনিয়োগের পরিবর্তে জমি কেনাবেচায় জড়িয়েছে, যাতে উভয় ক্ষেত্রেই টাকা মারতে পারে। বায়রা লাইফের বর্তমান প্রশাসক হুমায়ূন কবীরের নেতৃত্বে কোম্পানিটির ওপর তৈরি করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে। হুমায়ূন কবীর প্রতিবেদনটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক যুগ্ম সচিব হুমায়ূন কবীর মাসে সাড়ে তিন লাখ টাকার সুবিধা পেয়ে বায়রা লাইফে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির কাছে গ্রাহকের যে পাওনা রয়েছে, তার চেয়ে সম্পদ কম। দায়ের পরিমাণ বাড়ছে। তাই অবসায়ন করা ছাড়া বায়রা লাইফের অন্য কোনো গতি নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর খিলগাঁও পুনর্বাসন এলাকায় ২০১০ সালে দ্বিতল ভবনসহ ৮ কাঠার বেশি জমি কিনেছে বায়রা লাইফ। অথচ বিক্রেতা এই জমি বন্ধক রেখে অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, যা সুদে-আসলে এখন ছয় কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ রকম ভেজাল জমিতে বিনিয়োগের জন্য পর্ষদই দায়ী।

কোম্পানির প্রধান কার্যালয় যে ভবনে অবস্থিত, সেটির ১১ তলায় ১ হাজার ৭০০ বর্গফুটের একটি ফ্লোর কিনতে নিবন্ধন ছাড়াই বায়না চুক্তি করা হয় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকায়। এর বিপরীতে ১ কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধও করা হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল বাশারের স্ত্রী নাসরুন নেছার নামে দলিল হয়। অথচ ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা দলিল খরচও নেওয়া হয় কোম্পানি থেকেই।

সাভারের অজপাড়াগাঁয়ে ২০১৩ সালে ৪৭ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি কিনেছে বায়রা লাইফ। ৭২ লাখ টাকায় কেনা এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য আরও কম। জমিতে যাওয়ার কোনো রাস্তাই নেই।

ঢাকার বাইরে ফেনী শহরের রামপুরা মৌজার সিটি প্লাজায় ৩ হাজার ২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনতে ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বায়না চুক্তি করা হয় ২০১১ সালে। এখন পর্যন্ত এর দলিল হয়নি। পলিসি গ্রাহকদের টাকায় কেন এই ফ্ল্যাট কেনা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রশাসক। তিনি প্রতিবেদনে বলেছেন, ব্যাংক বা সরকারি কোনো সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হলে ১০ বছরে দ্বিগুণের বেশি মুনাফা পাওয়া যেত।

সাভারের অজপাড়াগাঁয়ে ২০১৩ সালে ৪৭ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি কিনেছে বায়রা লাইফ। ৭২ লাখ টাকায় কেনা এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য আরও কম। জমিতে যাওয়ার কোনো রাস্তাই নেই।

প্রতিবেদন অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার বালু নদের অপর পারে ৪০ কাঠা জমির জন্য ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা খরচ করেছে বায়রা লাইফ। এখনো এই জমির দলিল হয়নি। জমিতে বালু ভরাটও হয়নি। আবার ৪০ কাঠা জমির মধ্যে ২০ কাঠা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এর বিপরীতে বায়রা লাইফ এখন পর্যন্ত পেয়েছে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, বাকি টাকা এখনো পায়নি।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন মতে, গাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও অনিয়ম করেছে বায়রা লাইফ। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ আইডিআরএর অনুমোদন ছাড়াই সীমার বাইরে গিয়ে গাড়ি কিনেছে। ২০১৫ সালে ৯৭ লাখ টাকায় লেক্সাস এনএক্স-২০০ মডেলের গাড়ি কেনা হয়, যা ব্যবহার করেন কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল বাশার। গাড়ি কেনার জন্য ফিনিক্স ফাইন্যান্স থেকে ১৩ শতাংশ সুদে ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। ২০২০ সালে এসে গাড়িটি ৫১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।

প্রশাসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে কোম্পানির মেয়াদোত্তীর্ণ বিমা দাবির পরিমাণ ২৫ কোটি টাকা এবং পলিসি আছে ৬৩ কোটি টাকার। এগুলো পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোম্পানিটির কাছে গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধের মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত কোম্পানিটির আয়কর বকেয়া পড়েছে ১৩ কোটি টাকার বেশি।

অভিযোগগুলো যথাযথ নয়। প্রশাসক নিয়োগ পাওয়ার সাত মাস পার হলেও কোম্পানির কোনো উন্নতি হয়নি।
মোহাম্মদ আবুল বাশার, বায়রা লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান

এ ছাড়া বায়রা লাইফের কাছে সরকার ভ্যাট পায় ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আইডিআরএর জরিমানা বকেয়া আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে কয়েক বছরে ১৭ জন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে গ্রাহকদের মোট পাওনার পরিমাণ ৮০ কোটি টাকার বেশি।

অভিযুক্ত বায়রা লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল বাশারের কাছে প্রশাসকের তৈরি প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক মোবাইল ফোনে তুলে ধরা হলে গতকাল মঙ্গলবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগগুলো যথাযথ নয়। প্রশাসক নিয়োগ পাওয়ার সাত মাস পার হলেও কোম্পানির কোনো উন্নতি হয়নি।

আবুল বাশার জানান, গত ২৮ জানুয়ারি আইডিআরএর কাছে এক আবেদনে প্রশাসক নিয়োগ বাতিল করে শেয়ারহোল্ডারদের কাছে কোম্পানি ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ফেরত পেলে কোম্পানিটিকে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনা যাবে বলে তিনি আশাবাদী।

এদিকে আইডিআরএর সূত্রগুলো জানায়, সাবেক চেয়ারম্যানের আবেদন আপাতত বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন