শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পর্যায়ক্রমে সব জালিয়াতির বিরুদ্ধেই মামলা হবে। এসব রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে যেসব চালান রপ্তানি করবে, সেগুলোরও নিবিড় তদারকি করা হবে।
মোহাম্মদ ফখরুল আলম, কাস্টমস কমিশনার

২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৮টি প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য বা খাদ্যপণ্য ভুয়া রপ্তানি দেখায়। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বা তাঁদের অবহেলার সুযোগ নিয়ে রপ্তানির সব কাগজপত্র তৈরি করেন তাঁরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সার্ভারেও রপ্তানি দেখানো হয়। বাস্তবে কোনো পণ্য ডিপো বা বন্দরে আসেনি। এ নিয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘ভুয়া রপ্তানি, প্রণোদনা আত্মসাৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গত বছরের শুরুর দিক থেকে তদন্ত শুরু করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করে মামলা করে কাস্টমস।

কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পর্যায়ক্রমে সব জালিয়াতির বিরুদ্ধেই মামলা হবে। এসব রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে যেসব চালান রপ্তানি করবে, সেগুলোরও নিবিড় তদারকি করা হবে। আবার কাস্টমসের জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও প্রমাণ পাওয়ার পর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাস্টমসের তদন্ত অনুযায়ী, ডিওই ইমপেক্স লিমিটেডের ২০১৯ ও ২০২০ সালে ৩০টি চালানে বাস্তবে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি। এরপরও ২৯টি চালানের বিপরীতে ১৯ লাখ ৯ হাজার ডলার ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে রপ্তানি আয় হিসেবে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর বিপরীতে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড থেকে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা প্রণোদনা হাতিয়ে নিয়েছে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানটি।

যে ছয়টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো থেকে রপ্তানি জালিয়াতি হয়েছে, সেগুলো চট্টগ্রামের চারটি থানা এলাকায় পড়েছে। এ জন্য চারটি থানায় মামলা করেছে কাস্টমস। সব মামলায় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের দুই মালিক আসামি হিসেবে রয়েছেন।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ঘটনায় পণ্য রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে পাঁচটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান জড়িত। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে কে এইচ এল এক্সিম লিমিটেড, এ কে এন্টারপ্রাইজ, জিআর ট্রেডিং করপোরেশন, এ অ্যান্ড জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও প্যান বেঙ্গল এজেন্সিস লিমিটেড। এ ছাড়া ওশেন ফ্রেইট সিস্টেম, এভারেস্ট গ্লোবাল লজিস্টিকস ও গ্রিনভিউ লজিস্টিকস নামক তিনটি শিপিং এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এজেন্টের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ১১ এপ্রিল বন্দর থানায় প্রথম মামলা করে কাস্টমস। এতে ঢাকার ডিওই ইমপেক্স লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী জিয়া হায়দার, আলোক সেন গুপ্তসহ নয়জনকে আসামি করা হয়। এরপর ১২ এপ্রিল পতেঙ্গা থানায়, ১৩ এপ্রিল পাহাড়তলী থানায় এবং গত রোববার সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করা হয়। ভুয়া রপ্তানি চালান ছয়টি ডিপোতে কনটেইনারে বোঝাই হওয়ার নথিপত্র তৈরি করে রপ্তানিকারক। যে ছয়টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো থেকে রপ্তানি জালিয়াতি হয়েছে, সেগুলো চট্টগ্রামের চারটি থানা এলাকায় পড়েছে। এ জন্য চারটি থানায় মামলা করেছে কাস্টমস। সব মামলায় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের দুই মালিক আসামি হিসেবে রয়েছেন।

আগেও প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে কাস্টমসের সনদ লাগত। এবার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ভুয়া রপ্তানি করে প্রণোদনা আত্মসাতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভুয়া রপ্তানির বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজুল ইসলাম, মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক

বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে।’ সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে জানান, ‘মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে।’

রপ্তানিকারক ডিওই ইমপেক্সের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। তবে ৩ এপ্রিল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, কেউ শত্রুতা করে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে গতকাল সোমবার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতে প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানির আগে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে যাচাই করে একটি প্রত্যয়নপত্র দেবে। সেই প্রত্যয়নপত্র আবেদনের সঙ্গে দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। অর্থাৎ কাস্টমস কর্মকর্তারা সরেজমিন যাচাই করে পণ্য রপ্তানির সনদ দিলেই প্রণোদনা মিলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আগেও প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে কাস্টমসের সনদ লাগত। এবার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ভুয়া রপ্তানি করে প্রণোদনা আত্মসাতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভুয়া রপ্তানির বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিওই ইমপেক্সের তদন্ত শেষ হওয়ার পর এখন বাকি ১৭টি প্রতিষ্ঠানের ৪ কোটি ১৯ লাখ ডলার মূল্যের ৮৪২টি রপ্তানি চালান নিয়ে তদন্ত চলছে। নিয়ম অনুযায়ী, খাদ্যপণ্য ও কৃষিজাত পণ্যে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এ হিসাবে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আত্মসাৎ হওয়ার কথা ৭২ কোটি টাকা। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর জানা যাবে আসলে কত চালান রপ্তানি হয়নি এবং কত টাকা প্রণোদনা হিসেবে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন