প্রথম আলো: দেশে যত বিশ্বমানের স্থাপনা হচ্ছে, সব কটিতে বিএসআরএম রড সরবরাহ করছে। বিএসআরএমকে বেছে নেওয়ার কারণ কী?

আমের: বড় প্রকল্পে একসঙ্গে রডের চাহিদা বেশি থাকে। একটানা তিন–চার বছর ধরে রড সরবরাহ করতে হয়। প্রকল্পের চাহিদানুযায়ী যখন যত প্রয়োজন, তত পণ্য সরবরাহ করতে হয়। আবার প্রকল্প অনুযায়ী নির্ধারিত মান রক্ষা করতে হয়। প্রকল্প এলাকায় তাৎক্ষণিক সেবার নিশ্চয়তা দিতে হয়। এই তিন জায়গায় বিএসআরএমের শক্তি। সে জন্য যত বড় প্রকল্প হচ্ছে, সেখানে প্রথম পছন্দ থাকে বিএসআরএমের রড।

প্রকল্পে আমাদের পণ্য ব্যবহারের আগে দেশের বাইরের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখানে মান উত্তীর্ণ হয়েছে। আবার আমাদের একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ রড সরবরাহের সক্ষমতা আছে। আমাদের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকল্পে কোনো সমস্যা হয়নি। আমাদের পণ্যের মান নিয়ে তারা সন্তুষ্ট।

আপনারা জানেন, বিএসআরএম ১৯৫২ সাল থেকে রড উৎপাদন করে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ে ইস্পাত পণ্য উৎপাদনে মান উন্নত করাই আমাদের কালচারে পরিণত হয়েছে। আমাদের পরিবারের বিশ্বাস হচ্ছে, মানের সঙ্গে আমরা কখনোই আপস করব না।

প্রথম আলো: বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল পরিমাণ রড ব্যবহৃত হচ্ছে। বিএসআরএম কোন ধরনের পণ্য সরবরাহ করছে?

আমের: বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর সাগর উপকূলীয় এলাকায় পড়েছে। উপকূলীয় এলাকা সাধারণত লবণাক্ততা প্রবণ অঞ্চল। এ ধরনের বিশেষায়িত অঞ্চলের কথা চিন্তা করে চার বছর আগে বিএসআরএমই প্রথম বাজারে এনেছে এপোক্সি কোটেড বার। আমরা নাম দিয়েছি ‘সেঞ্চুরা’।

এ ধরনের বিশেষায়িত রডের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লবণাক্ততা থেকে ক্ষয়রোধ করা। এই বিশেষায়িত পণ্যটি ব্যবহার করলে লবণাক্ততা থেকে ক্ষয়রোধ করে স্থাপনার। এতে অবকাঠামো বা স্থাপনার স্থায়িত্ব বাড়ে। টেকসই হয়। শুধু সেঞ্চুরা নয়, বিশেষায়িত স্থাপনা নির্মাণে বিএসআরএমের বিশেষ বিশেষ পণ্য রয়েছে।

প্রথম আলো: চট্টগ্রামে নাছিরাবাদ শিল্প এলাকা, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপজেলায় আপনাদের কারখানা রয়েছে। নতুন করে বিনিয়োগের জন্য বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর কেন বেছে নিলেন?

আমের: বাংলাদেশে বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগ উপযোগী জমি পাওয়া। উপযোগী জায়গায় জমির দামও খুব বেশি। আবার কারখানা চালুর জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎসহ যেসব সুবিধা প্রয়োজন, তার নিশ্চয়তা দরকার। উদ্যোক্তারা নিজেরা এসব কিছু সমন্বয় করে শিল্প স্থাপন করা বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য এসবের চিন্তা করতে হয় না। জমি নিয়ে আইনগত কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। অর্থনৈতিক অঞ্চলে রাস্তাঘাট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির মতো সব সুযোগ–সুবিধা করে দিচ্ছে সরকার। এমন সুবিধা কোথাও পাওয়া যাবে না। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে আমরা নতুন করে বিনিয়োগ করছি। সেখানে নতুন ইস্পাত কারখানা করব।

প্রথম আলো: বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর ঘিরে কেমন সম্ভাবনা দেখছেন?

আমের: সরকার যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন করছে, তা খুবই ভালো উদ্যোগ। এতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। এই শিল্পনগর দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

প্রথম আলো: ইস্পাত খাতের চ্যালেঞ্জ কী কী?

আমের: যেকোনো খাতে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ থাকবে। চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করে সমাধান করাই মূল বিষয় হওয়া উচিত। বিশেষ করে শিল্পের কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত সিদ্ধান্ত দিয়ে সমাধান করা উচিত। আমাদের এখানে বন্দর সম্প্রসারণ অনেক আগে করা দরকার ছিল। আমরা দেরি করে ফেলেছি। বন্দরের সক্ষমতা বাড়লে উদ্যোক্তাদের কাঁচামাল আমদানিতে ক্ষতিপূরণ গুনতে হতো না। এখন অবশ্য বন্দর সম্প্রসারণের অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত।

আরেকটি কথা বলা দরকার, করব্যবস্থা এখনো জটিল। অনেক ক্ষেত্রে দ্বৈত করভার রয়েছে। করভারের ক্ষেত্রে সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা রাখা উচিত। আমরা দেখেছি, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) পরিশোধের পর কর রেয়াত হিসেবে রিফান্ড বা ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে দেরি হচ্ছে। এতে কিন্তু বিনিয়োগের পুঁজি আটকে থাকছে। এই টাকার ওপর সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

কারখানায় পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এর বাইরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। সে জন্য ব্যবসার খরচ কমানোর ওপর মূল ফোকাস রাখা উচিত সরকারের। তাহলে বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে এ দেশের শিল্প খাতগুলো।

প্রথম আলো: এ দেশের ইস্পাত খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন?

আমের আলীহোসাইন: দেশে এখন যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে তা অবকাঠামো উন্নয়নের শুরুর পর্যায় বলা যায়। এর অর্থ হলো আগামী ৪০ বছর অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকবে। উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে আমাদের আরও অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যেতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ বজায় থাকলে বিনিয়োগ আসবে। শুধু শিল্পকারখানা নয়, বাণিজ্যিক ও আবাসিক অবকাঠোমো হবে। সড়ক নির্মাণ হবে। আমাদের বড় শক্তি হলো বিপুল জনসংখ্যা। এটা বড় সুযোগ আমাদের জন্য। উন্নত বিশ্বের বহু দেশ অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জনশক্তি কম। আমাদের জনশক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। দেশ যত উন্নত হবে, ততই ইস্পাত পণ্যের ব্যবহার বাড়বে। ইস্পাত খাতের সম্ভাবনাও বাড়বে।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন