default-image

করোনাকালে কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন অনেক শ্রমিক। তাঁদের ৩ হাজার করে ৩ মাসে ৯ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়ার জন্য হাজার কোটি টাকার তহবিলও আছে। গত মাসে একটি নীতিমালাও করেছে সরকার। কিন্তু মালিকপক্ষের গড়িমসির কারণে একজন শ্রমিকও অর্থসহায়তা পাননি।

নীতিমালা অনুযায়ী অর্থসহায়তা দিতে যোগ্য শ্রমিকদের একটি তালিকা করতে হবে। সেই তালিকা তৈরির প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কারখানার পাশাপাশি চারটি ব্যবসায়ী সংগঠনের। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর কয়েকটি সদস্য কারখানা তালিকা দিলেও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো তেমন কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তাতে পুরো আয়োজনটিই মাঠে মারা যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

করোনাকালে ছাঁটাইয়ের শিকার শ্রমিকদের সহায়তা দিতে ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার সমান ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর তহবিল দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জার্মান সরকার। সেই তহবিল থেকে কর্মহীন শ্রমিকদের কীভাবে সহায়তা দেওয়া হবে, তা ঠিক করে শ্রম মন্ত্রণালয় ৭ অক্টোবর ‘রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাশিল্পের কর্মহীন হয়ে পড়া ও দুস্থ শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন’ শীর্ষক নীতিমালার গেজেট প্রকাশ করেছে।

বিজ্ঞাপন

নীতিমালায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক নির্ধারণে আটটি মানদণ্ড ঠিক করা হয়। সেগুলো হচ্ছে রপ্তানিমুখী পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাশিল্পে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মরত শ্রমিক, শারীরিকভাবে অক্ষম, প্রসূতি কল্যাণ সুবিধাবঞ্চিত সন্তান জন্মদানকারী, করোনা বা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত, শ্রম আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার শর্তের আওতার বাইরে থাকা শ্রমিক, ছাঁটাই হওয়া ও বর্তমানে কর্মহীন, লে-অফ হওয়া কারখানার কর্মহীন শ্রমিক এবং গত ৮ মার্চের পর চাকরি হারানো শ্রমিক। কোনো শ্রমিক এসব শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করলেই সহায়তা পাওয়ার যোগ্য হবেন।

পোশাক ও চামড়া খাতের দুজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা আন্দোলন-সংগ্রাম করে পাওনা আদায় করে নিয়েছেন। তাই অর্থসহায়তার জন্য শ্রমিকের নাম দিতে চান না অধিকাংশ উদ্যোক্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শ্রমিকদের সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজে হাতই দেয়নি নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ)। লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) তালিকা করলেও তা শ্রম অধিদপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেয়নি। আর বিজিএমইএ সদস্য কারখানাগুলোকে তালিকা পাঠাতে একটি নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব সেরেছে।

পোশাক ও চামড়া খাতের দুজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা আন্দোলন-সংগ্রাম করে পাওনা আদায় করে নিয়েছেন। তাই অর্থসহায়তার জন্য শ্রমিকের নাম দিতে চান না অধিকাংশ উদ্যোক্তা। অনেকে আবার ঝামেলা এড়াতে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের তথ্য প্রকাশ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
নীতিমালা জারি করতেই চলতি ২০২০–২১ অর্থবছরের তিন মাস কেটে গেছে।

আমরা তালিকা কোথা থেকে দেব। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা আবার যে কাজে যোগ দেননি, সেটি কীভাবে নিশ্চিত হব। আমাদের তথ্যভান্ডার নেই।
বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম

নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত শ্রমিকেরা ৩ মাস ৩ হাজার করে সর্বোচ্চ ৯ হাজার টাকা পাবেন। শ্রমিক যদি তিন মাসের মধ্যে আগের বা নতুন কোনো কারখানায় চাকরি পেয়ে যান, তাহলে যে মাসে কাজে যোগ দেবেন, সেই মাস থেকে তিনি নগদ সহায়তা পাবেন না।

বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমরা তালিকা কোথা থেকে দেব। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা আবার যে কাজে যোগ দেননি, সেটি কীভাবে নিশ্চিত হব। আমাদের তথ্যভান্ডার নেই।’

অন্যদিকে বিএফএলএলএফইএর চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, ‘চামড়া খাতে ২০১৭ সালেই ৩০ শতাংশ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছিলেন। করোনায় তেমন চাকরি যায়নি। কারখানামালিক ও শ্রমিক সংগঠনের কাছে চেয়েও আমরা কোনো শ্রমিকের তালিকা পাইনি।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, ১০ লাখ শ্রমিককে সহায়তা দেওয়ার চিন্তা থেকে নীতিমালা জারি হলেও এখন ৫০ হাজার শ্রমিক পাওয়াই কষ্টকর হবে। আবার শ্রম মন্ত্রণালয় নীতিমালা জারি করলেও কাজটি করে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিজিএমইএর সদস্য কারখানা কয়েক হাজার শ্রমিকের তালিকা দিয়েছে। তবে সেখানে তথ্যগত ত্রুটি–বিচ্যুতি রয়েছে। আমরা যাচাই–বাছাই করব। অন্য সংগঠন থেকে আমরা কোনো তালিকা পাইনি। তাদের কেউ কেউ নানা রকম সীমাবদ্ধতার কথা বলছে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0