জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিবিএস যে তথ্য–উপাত্ত দিয়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হিসাব করছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার খুব বেশি মিল নেই। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও খনিজ পণ্য উৎপাদনে তেমন প্রবৃদ্ধি নেই, কিন্তু শিল্পকারখানায় উৎপাদন বেশি। শিল্পকারখানায় বেশি উৎপাদন হলে তো বেশি গ্যাস-বিদ্যুৎ লাগত। তাই শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি প্রশ্নবিদ্ধ।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা এখনো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পর্যায়ে আছি। করোনার প্রথম বছরে দুই-তিন মাস শিল্পকারখানায় উৎপাদন কম হয়েছে। তাই ওই বছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে। তাই ভিত্তি ছোট হওয়ায় পরের বছর সাড়ে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। ভিত্তিও বড় হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরেও শিল্প খাতে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি মেলানো যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় গিয়ে কর ছাড় চাচ্ছেন। ব্যবসা ভালো হলে তো কর ছাড়ের পরিবর্তে বেশি কর দেওয়ার কথা। বাস্তবে পর্যাপ্ত শুল্ক-করও আদায় হচ্ছে না।’

ব্যবসায়ীরা প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় গিয়ে কর ছাড় চাচ্ছেন। ব্যবসা ভালো হলে তো কর ছাড়ের পরিবর্তে বেশি কর দেওয়ার কথা। বাস্তবে পর্যাপ্ত শুল্ক-করও আদায় হচ্ছে না।
জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়

একটি দেশের অভ্যন্তরে এক অর্থবছরে শিল্প খাতে কী পরিমাণ পণ্য বা সেবা সৃষ্টি হয়, সেটার টাকার মূল্যের মাধ্যমে জিডিপিতে শিল্প খাতের আকার ও প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে স্থিরমূল্যে দেশের শিল্প খাতে ৯ লাখ ৮১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে, যা এর আগের বছরের চেয়ে ৯১ হাজার কোটি টাকা বেশি। আর চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে শিল্প খাতে মূল্য সংযোজনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ১০ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। করোনার মধ্যেও শিল্প খাতে এত মূল্য সংযোজনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা।

শিল্প খাতের মধ্যে উৎপাদন খাতের প্রাণ হলো দেশের ৪৬ হাজারের বেশি ছোট-বড় কলকারখানা। এসব কলকারখানার মূল জ্বালানি হলো বিদ্যুৎ ও গ্যাস। উৎপাদন খাতে ১২ দশমিক ৩১ প্রবৃদ্ধি হবে। যেসব কলকারখানা এই প্রবৃদ্ধি আনল, সেসব কলকারখানার জ্বালানি খাতে কিন্তু এত প্রবৃদ্ধি হয়নি। বিবিএসের হিসাবে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরে মূল্য সংযোজনে প্রবৃদ্ধি হবে যথাক্রমে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ ও দশমিক ৫২ শতাংশ। আবার খনিজ সম্পদ আহরণে মূল্য সংযোজন আগেরবারের চেয়ে কমেছে। হিসাবের এই গরমিলের কারণেই প্রশ্ন উঠেছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন খাতে সাড়ে ১১ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। সেই ভালো প্রবৃদ্ধির ওপর এবারও ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হবে। এর মানে, সরকারি হিসাবে দুই বছর ধরে শিল্প খাত ব্যাপকভাবে চাঙা আছে।

কিন্তু বাস্তবে সেই পরিস্থিতি নেই। বিবিএসের শিল্প উৎপাদন সূচকের একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বিবিএসের গত ডিসেম্বর মাসের শিল্প উৎপাদন সূচকে দেখা গেছে, বস্ত্র ও পোশাক ছাড়া বড় শিল্প খাতগুলোর আগের বছরের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় উৎপাদন কমেছে। যেমন, পাট ও পাটপণ্য, সার, ভোজ্যতেল ও জ্বালানি তেল (পরিশোধন), রড, সিমেন্ট, সাবানসহ প্রসাধনসামগ্রী।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন যে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথগতিতে চলছে। এখনো ঘুরে দাঁড়ায়নি। বহু ছোট কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। টিকে থাকতে তাঁরা বিভিন্ন খাতে কর ছাড় চান। গত মার্চ মাসে এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত বাজেটসংক্রান্ত পরামর্শক সভায় দুই শতাধিক প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বেশির ভাগই শুল্ক-করে ছাড়সংক্রান্ত।

ব্যবসায়ীরা যখন কোভিডের পর নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য আগামী বাজেটে কর ছাড়ের প্রস্তাব করেছেন, তখন বিবিএস বলছে, শিল্প খাত দুই বছর ধরে বেশ চাঙা আছে এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি এবং এ কে খান গ্রুপের পরিচালক আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, বস্ত্র ও পোশাকের মতো বড় দুই-তিনটি খাত ছাড়া দেশের শিল্প খাত পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সার্বিকভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন করোনার আগের পর্যায়ে যায়নি। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে, সেখান থেকে অতিক্ষুদ্র ও ছোট কলকারখানার মালিকেরা অর্থ পাননি।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন