সমস্যা চিহ্নিত, তবে সমাধান হয়নি

ঋণ নিয়ে জটিলতা চলছে। হাজারীবাগও রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত। আজ বৈঠকে বসছে চামড়াশিল্পের উন্নয়নে গঠিত টাস্কফোর্স।

চামড়াশিল্পের উন্নয়নে দুই বছর আগে শিল্পমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। এই শিল্পের সমস্যা চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের উপায় নির্ধারণের কথা টাস্কফোর্সের। এখন পর্যন্ত মাত্র দুবার টাস্কফোর্সের বৈঠক হয়েছে। সমস্যাও চিহ্নিত হয়েছে, কিন্তু দুই বছরেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এই অবস্থায় আজ সোমবার তৃতীয় বৈঠকে বসছে টাস্কফোর্স। এতে রয়েছেন ৪ জন মন্ত্রী, ১০ জন সচিব।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প সাভারে স্থানান্তর হওয়ার পর অনেক ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি হয়ে যান। এক বছর আগে গত বছরের ২২ জুন টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় বৈঠকের সময়ে চামড়াশিল্পের মালিকদের দাবি ছিল, ঋণখেলাপি থেকে ব্যবসায়ীদের মুক্তি দিতে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের ব্যাংকঋণের সুদ মওকুফ করা। এ ছাড়া চামড়াশিল্পের মালিকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয় ওই বৈঠকে। পাশাপাশি হাজারীবাগকে রেড জোন বা লাল অঞ্চল থেকে গ্রিন জোন বা সবুজ অঞ্চল ঘোষণার বিষয়েও সভায় ঐকমত্য হয়।

কিন্তু চামড়াশিল্পের মালিকেরা এখন বলছেন, এক বছর আগে আলোচিত বিষয়গুলোর কিছুই সুরাহা হয়নি। পুরোনো সেই সব বিষয় নিয়েই আজ আবার আলোচনা হবে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত এক বছরে আমরা তেমন কিছুই পাইনি। হাজারীবাগ থেকে সাভারে এখন পর্যন্ত ১৫৭ কারখানা স্থানান্তর হয়েছে। যার মধ্যে ১৩০ ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি। সাভারে যাওয়ার পরই তাঁরা ঋণখেলাপি হয়েছেন। আমরা ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের ঋণের সুদের হার মওকুফের দাবি করেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে দাবি পূরণ হয়নি।’

সাখাওয়াত উল্লাহ আরও বলেন, ‘হাজারীবাগকে যদি সবুজ অঞ্চল ঘোষণা করা হতো, তাহলে আমরা সেই জায়গার উন্নয়ন কিংবা বিক্রি করতে পারতাম। কিন্তু সেটিও হয়নি।’

চামড়াশিল্পের মালিকদের অভিযোগ, সাভারে চামড়া শিল্পনগর স্থানান্তর হলেও এখন পর্যন্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট) হয়নি। যার ফলে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) মান রক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রস্তুতি ছাড়া হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্পনগর যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মোস্তাক হাসান বলেন, ‘চামড়াশিল্পের মালিকেরা আমাদের দোষত্রুটির কথা বলছেন। তাঁদের যেসব কাজ তাঁরা তো সেগুলো করছেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টে ১০০ নম্বর। অথচ পরিবেশ উন্নতির জন্য চামড়াশিল্পের মালিকদের হাতে আছে ১ হাজার ২১৫ নম্বর। আমরা এক বছরের মধ্যেই সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু তাঁরা সেখানে যেসব কাজ করার কথা, সেসব করছেন না।’

গত বছরের ২২ জুন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছিলেন, ২০১৭ সাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চামড়াশিল্পের মালিকদের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প সাভারে স্থানান্তরের পর থেকে ব্যাংকের সঙ্গে ট্যানারি মালিকদের সমস্যা বাড়তে থাকে। ট্যানারি মালিকেরা ঋণখেলাপি হতে শুরু করেন।

ওই সভায় সালমান এফ রহমান আরও বলেন, সাভারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরি না হওয়ায় নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে চলে যাওয়ার পর হাজারীবাগের জমিকে রাজউক লাল অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে। এতে করে চামড়াশিল্পের মালিকেরা ওই সম্পত্তি উন্নয়ন কিংবা বিক্রি করতে পারছেন না। গৃহায়ণ ও গণপূর্তসচিব সমস্যা সমাধানের কথা দিলেও সমাধান হয়নি। সে জন্য হাজারীবাগের জমি যত দ্রুত সম্ভব রেড জোন থেকে সবুজ জোনে নেওয়ার তাগিদ দেন সালমান।

এদিকে এক বছর পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানিয়েছে, তাদের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) হাজারীবাগের ট্যানারি এলাকা লাল অঞ্চল নয়, ওপেন স্পেস হিসেবে চিহ্নিত আছে। ট্যানারিতে দূষিত বর্জ্য এবং ক্রোমিয়ামের কারণে ওই এলাকার মাটির স্তর ৮ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত দূষিত, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। রাজউক ওই এলাকার জন্য একটি সার্বিক পরিকল্পনা তৈরি করছে। যেটির মাধ্যমে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে দূষণের মাত্রা কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে। ড্যাপ শিগগিরই গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। ওই গেজেট প্রকাশের পর নীতিমালা অনুযায়ী সবাই ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাবেন।

এদিকে আজকের বৈঠকে আসন্ন ঈদুল আজহার সময়ে চামড়া সংরক্ষণের জন্য সারা দেশে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এখন সাড়ে ১৩ লাখ টন লবণ মজুত আছে। আশা করছি, কোরবানির সময়ে লবণের কোনো ঘাটতি থাকবে না।’

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, তাঁরা আজকের টাস্কফোর্সের সভায় চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ দাবি করবেন।