default-image

বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া এলাকা থেকে বন্দরের তিনটি নোঙর এলাকায় বড় জাহাজ আনার পাইলট সেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। এ জন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। স্পর্শকাতর এই সেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে আপত্তি তুলেছে শিপিং এজেন্টরা।

সাগর থেকে বন্দরের জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর সময় বন্দরের নিজস্ব পাইলটরা জাহাজের মাস্টারকে সহায়তা করেন। কর্ণফুলী নদীর বিশেষায়িত নৌপথে দুর্ঘটনা এড়াতে পাইলটের সহায়তা নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে এত দিন কুতুবদিয়া থেকে পতেঙ্গার অদূরে বহির্নোঙর এলাকায় জাহাজ আনার কাজে পাইলট নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল না। শিপিং এজেন্টরা জাহাজের মাস্টারকে সহায়তা করার জন্য স্থানীয় অভিজ্ঞ নাবিকদের নিয়োগ দিতেন।

বিজ্ঞাপন

বন্দর কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, বহির্নোঙরে দুর্ঘটনার হার বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু করতে এ সিদ্ধান্ত নেয় বন্দর। এরই অংশ হিসেবে সেবা খাতের কাজটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানো হচ্ছে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে একতরফাভাবে জাহাজপ্রতি দেড় হাজার ডলার বা ১ লাখ ২৭ হাজার টাকার মতো সেবা ফি এবং প্রতিদিন অবস্থানের জন্য ৩০০ ডলার বা ২৫ হাজার টাকা ফি চেয়েছে। ন্যূনতম দুই দিন অবস্থান ধরে গড়ে ২ হাজার ১০০ ডলার বা ১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা গুনতে হবে জাহাজপ্রতি।

পাইলট সেবায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করায় ৬৫টি শিপিং এজেন্ট আপত্তি তুলেছে। আলাদা করে সি কম, আকিজ শিপিং, প্রাইড শিপিং, মদিনা লজিস্টিকসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও চিঠি দিয়েছে বন্দর চেয়ারম্যানকে। এসব চিঠিতে বলা হয়েছে, তারা নিজেরাই কাজটি করছে। কাজ পাওয়া পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে নামসর্বস্ব আখ্যা দিয়ে চিঠিতে বলা হয়, এই ব্যবস্থা বন্দরে নতুন সিন্ডিকেট তৈরি করবে।

শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনা রোধে বন্দর যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটা মানতে কোনো আপত্তি নেই। তবে ‘নেভিগেশনাল’ বিষয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি বেসরকারিখাতে কেন ছেড়ে দিতে হবে? বন্দরনির্ধারিত মাশুলের বিনিময়ে নিজেরা এই সেবা দিলে কারও আপত্তি থাকবে না।

দেশের সমুদ্রপথে যে পরিমাণ পণ্য আনা-নেওয়া হয়, তার ৯৩ শতাংশই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এই বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া সিংহভাগ পণ্যই বহির্নোঙরে খালাস করা হয়। গত ২০১৯–২০ অর্থবছরে শুধু বহির্নোঙরে পণ্য খালাস হয় ১ হাজার ৪৬৪ জাহাজ থেকে। এর সিংহভাগই সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের (পানির নিচের অংশের গভীরতার মাপ)।

বন্দর কেন এই সেবা দিতে পারছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে বন্দরের পর্ষদের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জনবলসংকটের কারণে বহির্নোঙরে আপাতত এই সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য সাময়িকভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বন্দরের জনবল বাড়লে নিজেরাই করার সুযোগ হবে। বেসরকারি খাতে হলেও কেউ এই সেবা জিম্মি করতে পারবে না।’

বিজ্ঞাপন

যে পাঁচ প্রতিষ্ঠান কাজ পেল

সাগরে পাইলট সেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে ২০১৯ সালের অক্টোবরে তালিকাভুক্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় বন্দর। তালিকাভুক্তির জন্য বন্দরের লাইসেন্সধারী পাইলট থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু বন্দর থেকে অবসর নেওয়া পাইলটের সংখ্যা কম থাকায় বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারেনি। আগ্রহ দেখায় মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠান। তাদের মধ্য থেকে পাঁচটিকে বাছাই করে গত বছরের ২২ মার্চে তালিকাভুক্ত করা হয়। এরই মধ্যে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি এত দিন। করোনার ধাক্কা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার পর এখন তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

তালিকাভুক্ত পাঁচ প্রতিষ্ঠান হলো জুনের শিপিং লাইনস, আয়ার শিপিং সার্ভিসেস, বাংলাদেশ সি গোয়িং পাইলট সার্ভিস কোম্পানি, কেএমসি শিপিং ও ডিএমএসসি। এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বা চেয়ারম্যানদের তিনজন হলে নারী। তাঁদের স্বামীরা মূলত এই খাতের সঙ্গে জড়িত। তবে শিপিং এজেন্ট লাইসেন্স থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি কম বলে জানান খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে ডিএমএসসির চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন (মাস্টার মেরিনার) মাসুদ রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘লাইসেন্সধারী পাইলট দিয়ে আমরা এই সেবা দেব। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একজন মাস্টার মেরিনার থাকবেন।’

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন