৮০ শতাংশেরই মজুরি কমেছে

করোনাভাইরাসের প্রভাবে চার শিল্প খাতের ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন শ্রমিকের মধ্যে ৮০ জনেরই মজুরি কমেছে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রমিকদের ধারকর্জের জন্য হয় আত্মীয়স্বজন, নয়তো ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। আবার কাউকে কাউকে নিতে হয়েছে সরকারের দেওয়া খাদ্যসহায়তা। তৈরি পোশাক, চামড়া, নির্মাণ ও চা—এই চার শিল্প খাতের শ্রমিকদের ওপর করা এক যৌথ জরিপে এসব তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও সুইডেনের ওয়েজ ইন্ডিকেটর ফাউন্ডেশন (ডব্লিউআইএফ)। তবে জরিপটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

জরিপে দেখা গেছে, এই চার খাতের নারী শ্রমিকেরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ৭৭ শতাংশ কম মজুরি পান। চার খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুরি পান নির্মাণশিল্পের শ্রমিকেরা। আবার তাঁরাই আছেন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। কারণ, এই শিল্পে কর্মরত কোনো শ্রমিকেরই যৌথ চুক্তি নেই, যা অন্য তিনটি খাতে কিছুটা হলেও আছে। নিরাপত্তার দিক থেকেও তাঁরা বেশি পিছিয়ে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় তাঁদের। অন্যদিকে সবচেয়ে কম মজুরি পান চা-শিল্পের শ্রমিকেরা।

দেশে এক দশক ধরে সড়ক, মহাসড়ক, রেলওয়ে, বন্দর ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে। ফলে নির্মাণশিল্পে কর্মীর চাহিদা, তথা কর্মসংস্থান বেড়েছে। যেমন ২০১৫ সালে যেখানে নির্মাণশিল্পে ৩৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন, সেখানে তা বেড়ে এখন ৪০ লাখে উঠেছে। অবশ্য বিপুল এই শ্রমিকদের মাত্র এক-দশমাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন স্থায়ী নিয়োগ চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন। বাকিরা কোনো ধরনের নিয়োগপত্র ছাড়াই কাজ করছেন। তাঁরা সাধারণত সরবরাহকারী ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করেন।

বিজ্ঞাপন

জরিপের তথ্য বলছে, চারটি খাতের মধ্যে মাসে গড়ে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৫৪৭ টাকা করে মজুরি পান নির্মাণশিল্পের একজন শ্রমিক। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চামড়া খাতের একজন শ্রমিক মাসে মজুরি পান ১০ হাজার ৮০০ টাকা। পোশাকশিল্প তৃতীয় অবস্থানে। এই খাতের একজন শ্রমিকের মাসিক গড় মজুরি ৯ হাজার ৪৫৭ টাকা। সর্বনিম্ন মজুরি চা-শিল্পে। এই খাতের একজন শ্রমিক মাসে পান মাত্র ৩ হাজার ৯২ টাকা।

বিআইডিএস ও ডব্লিউআইএফ গত বছরের আগস্ট থেকে নভেম্বর সময়ে র‍্যান্ডম স্যাম্পলিং বা দৈবচয়নের ভিত্তিতে ‘শোভন মজুরি’ শীর্ষক এই জরিপ পরিচালনা করেছে। এতে চার খাতের মোট ১ হাজার ৮৯৪ জন শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৬৫টি তৈরি পোশাক কারখানার ৭২৪ জন, ৩৪টি চামড়া কারখানার ৩৩৭ জন, পাঁচটি চা-বাগানের ৪০১ জন এবং নির্মাণশিল্পের ৪৩২ জন শ্রমিক রয়েছেন। জরিপ পরিচালনায় অর্থায়ন করে নেদারল্যান্ডসের সংস্থা মন্ডিয়াল এফএনভি। এই জরিপ করার উদ্দেশ্য ছিল, চারটি খাতে প্রকৃত মজুরি কত, শ্রমিকদের আয়-ব্যয়ের অবস্থা, করোনায় তাঁদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং যৌথ চুক্তিপত্র আছে কি না, এসব দেখা।

জরিপে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের ৮৩ শতাংশই জানান, করোনার কারণে যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়, তখন তাঁরা কাজে উপস্থিত ছিলেন না। আর অনুপস্থিত সব শ্রমিকেরই মজুরি কমানো হয়েছে। তবে জরিপে সার্বিকভাবে ৭০ শতাংশ শ্রমিকের বার্ষিক বোনাস পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

জরিপের ফলাফল সম্পর্কে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মিনহাজ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমিকেরা যে খাতেরই হোন না কেন, তাঁদের অনেকেই চুক্তির আওতায় নেই। করোনার প্রভাবে শ্রমিকদের মজুরি কমে গেছে। যে কারণে সংসার পরিচালনায় আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সহযোগিতা নিতে হয়েছে শ্রমিকদের।

মজুরি কমে যাওয়ার পরে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, জরিপে এমন প্রশ্নের জবাবে ৬৬ শতাংশ শ্রমিক জানান, তাঁরা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। ২৩ শতাংশ বলেছেন সরকারের দেওয়া খাদ্যসহায়তা নেওয়ার কথা। আবার ২০ শতাংশ শ্রমিক জানান, ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া ৯ শতাংশ নিয়োগকর্তার কাছ থেকে রেশন পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

জরিপে জানতে চাওয়া হয়েছিল শ্রমিকদের যৌথ শ্রম চুক্তি আছে কি না? এ ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে চারটি খাতের ৭০ শতাংশ শ্রমিকই ‘না’-সূচক উত্তর দেন। নিজেদের যৌথ শ্রম চুক্তির আওতায় থাকার কথা বলেন মাত্র ১৮ শতাংশ শ্রমিক। ৬০ শতাংশ শ্রমিক মনে করেন, চুক্তির আওতায় থাকা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাকি ৪০ শতাংশের মতে, চুক্তি থাকা জরুরি।

জরিপ অনুযায়ী যৌথ শ্রম চুক্তিতে নারী শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তি পুরুষ শ্রমিকদের দ্বিগুণ। চা-বাগানে অর্ধেকের বেশি শ্রমিক চুক্তির আওতায়। চামড়া খাতে আছেন ২০ শতাংশ শ্রমিক। তৈরি পোশাক খাতে এই হার মাত্র ১০ শতাংশ। নির্মাণশিল্পের কোনো শ্রমিকই চুক্তির আওতায় নেই।

জরিপ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তুলনামূলকভাবে তৈরি পোশাকশিল্পেই মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সাবান ব্যবহার এবং তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের ব্যবস্থা বেশি।

বিজ্ঞাপন
শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন