default-image

মোটরসাইকেলশিল্পের বাংলাদেশ যাত্রা

বাংলাদেশের মোটরসাইকেলশিল্প বয়সে নবীন। এর আগে ভারত থেকেই মূলত মোটরসাইকেল আমদানি করা হতো। ভারতে মোটরসাইকেলশিল্পের যাত্রা শুরু হয় গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে। ১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি রয়্যাল এনফিল্ড মাদ্রাজ মোটরসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে চেন্নাইয়ে একটি সংযোজন কারখানা করে। এরপর জাপানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ভারতে কারখানা গড়ে ওঠে।

বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যেসব ভারতীয় কোম্পানি মোটরসাইকেল তৈরি শুরু করেছিল, পরে তারা নিজেরাই আলাদা ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। কেউ কেউ শুরুতে আমদানিকারক ছিল। পরে উৎপাদনকারী হয়। যেমন ভারতীয় ব্র্যান্ড বাজাজ ১৯৪৪ সালে মোটরসাইকেল আমদানির ব্যবসা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তারা দুই চাকা ও তিন চাকার যানবাহন উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

বাংলাদেশেও ভারতীয় ও জাপানি ব্র্যান্ডের পরিবেশকেরাই মূলত পরে যৌথ উদ্যোগে কারখানা করেছে। যেমন বাজারের সবচেয়ে বড় হিস্যাধারী ভারতের বাজাজ ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনের কারখানা করেছে উত্তরা মোটরস। ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে সাভারের জিরানিতে তাদের নতুন কারখানায় মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু হয়। বাজাজের কারখানাটির নাম ট্রান্স এশিয়া ইন্ডাস্ট্রিজ।

ভারতীয় আরেক ব্র্যান্ড টিভিএসের মোটরসাইকেল উৎপাদনের জন্য সনি-র‌্যাংগসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রিয়ান মোটরস ও ভারতের টিভিএস অ্যান্ড সন্সের যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠিত টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেড। তারা কারখানা করেছে গাজীপুরের টঙ্গীতে। ভারতের হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদক হিরো মোটোকর্পের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কারখানা করেছে নিটল-নিলয় গ্রুপ। এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড নামের কোম্পানির অধীন প্রতিষ্ঠিত কারখানাটি যশোরে।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় বেসরকারি আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনে বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের (বিএইচএল) কারখানার অংশীদার জাপানের হোন্ডা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল শিল্প সংস্থা (বিএসইসি)। বাংলাদেশেই জাপানের সুপরিচিত ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের কারখানা করেছে এসিআই মোটরস। এতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ইয়ামাহা। কারখানাটি গাজীপুরের শ্রীপুরে।

মোটরসাইকেলের আরেকটি জনপ্রিয় জাপানি ব্র্যান্ড সুজুকিও উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। এ দেশে সুজুকির পরিবেশক র‌্যানকন মোটর বাইক লিমিটেড (আরএমবিএল)। সুজুকি ও র‌্যানকন মিলে গাজীপুরে কারখানা করেছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় কারখানা রয়েছে একমাত্র দেশীয় ব্র্যান্ড রানারের।

রাসেল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও স্পিডোজ লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কারখানা করেছে। রয়্যাল এনফিল্ড ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাংলাদেশে বিপণনের উদ্যোগ নিয়েছে ইফাদ অটোস। দেশে মোটরসাইকেলশিল্প গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের নীতিসহায়তা। শুরুর দিকে সরকার শিল্প খাতের সঙ্গে পরামর্শ করে বাজার বড় করার জন্য মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে দেয়। পরে দেশে উৎপাদনের শর্তে কর ছাড়ও দেওয়া হয়।

যেমন ২০১৩–১৪ অর্থবছরে খোলা অবস্থায় (সিকেডি) মোটরসাইকেল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ছিল ৩০ শতাংশ, যা পরের বছর ৪৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ২০১৬–১৭ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে সরকার। শুল্ক কমানোয় তখন সিসিভেদে মোটরসাইকেলের দাম ১০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা কমে যায়। অবশ্য তখন দেশে উৎপাদনের শর্ত দেওয়া হয়েছিল। মোটরসাইকেল বিক্রিও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে ২০১৭ সাল থেকে। ২০১৬ সালে যেখানে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল ২ লাখ ৭০ হাজার। পরের বছর তা ৪৪ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ৮০ হাজারে উন্নীত হয়।

২০১৮ সালে সরকার জাতীয় মোটরসাইকেলশিল্প উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করে। এতে ২০২১ সালের মধ্যে দেশে বছরে ৫ লাখ এবং ২০২৭ সালের মধ্যে ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের কথা বলা হয়। এ নীতিমালায় সরকার দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনে কর ছাড়, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছিল। ২০১৮ সালের দিকে বেশ কয়েকটি কারখানা মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এখন জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর বেশির ভাগ মডেলের মোটরসাইকেল দেশেই তৈরি করে। তবে বেশি দামি কিছু মডেলের মোটরসাইকেল সম্পূর্ণ যুক্ত (সিবিইউ) অবস্থায় দেশে আমদানি করা হয়।

সহযোগী শিল্পে নজর দরকার

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে এখন দরকার মোটরসাইকেলের সহযোগী শিল্প গড়ে তোলা। কারখানা অনেকগুলো হয়েছে। তবে সে অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা ভেন্ডর গড়ে ওঠেনি। উল্লেখ্য, সহযোগী শিল্প মূল ব্র্যান্ডের জন্য নানা যন্ত্রাংশ তৈরি করে দেয়। ভারতে কোম্পানিগুলোর অনেকগুলো সহযোগী শিল্প রয়েছে।

জানতে চাইলে টিভিএস অটো বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিপ্লব কুমার রায় প্রথম আলোকে বলেন, দেশে বার্ষিক মোটরসাইকেলের চাহিদা সাড়ে পাঁচ লাখ। এই অল্পসংখ্যক চাহিদা দিয়ে যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা লাভজনক হবে না। তিনি বলেন, মোটরসাইকেলের বাজার বড় হলে দ্রুতই সংযোগ শিল্প গড়ে উঠবে।

দুশ্চিন্তা দুর্ঘটনা নিয়ে

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণা বলছে, প্রতিবছর দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরসাইকেলের বিপরীতে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন ২৮ জনের মতো, যা গবেষণায় আসা ১৬টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বুয়েটের গবেষণায় যে ১৬টি দেশের কথা উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন ভিয়েতনামের মানুষ। সেখানে প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে মোটরসাইকেল আছে ৩৫৮টি। বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য মোটরসাইকেল আছে মাত্র ৭টি। কিন্তু ভিয়েতনামে দুর্ঘটনার হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম, ৪ দশমিক ১ (প্রতি ১০ হাজার মোটরসাইকেলের বিপরীতে)।

বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলো বলছে, এ দেশে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বড় কারণ মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, একেবারেই হেলমেট না পরা, প্রশিক্ষণ ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সড়কে নিয়ম না মানা ইত্যাদি। এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কোম্পানিগুলো কাজ করছে। সরকারি উদ্যোগও দরকার।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন