default-image

১. ন্যূনতম জ্ঞান দরকার

বিনিয়োগকারী অনেক রকমের হয়। সবাই উচ্চশিক্ষিত হবে, এমন নয়। আবার উচ্চশিক্ষিত হলেই যে শেয়ারবাজার সবাই বুঝবেন, সেটিও নয়। আবার আমাদের দেশে এমনও দেখা যায়, যাঁরা অর্থনীতি, অ্যাকাউন্টিং, ফিন্যান্স ইত্যাদি পড়ছেন বা পড়াচ্ছেন তাঁদের মধ্যে শেয়ারবাজার নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ নেই। আবার এমন নজিরও আছে হিসাববিদ (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট) হয়েও অনেকে শেয়ারবাজারে ভালো করতে পারেন না। সবই বাস্তবতা। আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জানা–বোঝা লোকজনও শেয়ারবাজারে ভালো করতে পারেন না। তার বড় কারণ তাঁরা তাঁদের জ্ঞান ও জানা–বোঝাকে যথাযথভাবে কাজে লাগান না। সবাই শুনে শুনে শেয়ার কেনেন। কিছুদিন ধরে শেয়ারবাজার ভালো অবস্থায় রয়েছে। নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে যুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষিত বিনিয়োগকারী যেমন আছেন, তেমনি আছেন বাজার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই এমন বিনিয়োগকারী। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতি আমার প্রথম পরামর্শ জ্ঞান আহরণ করা। জানার কোনো বিকল্প নেই। এখন শেয়ারবাজারবিষয়ক অনেক ইনস্টিটিউট বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে স্বল্পমেয়াদি কিছু প্রশিক্ষণ হলেও অন্তত বিনিয়োগের আগে নেওয়া উচিত।

২. মুনাফার প্রবৃদ্ধি দেখুন

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রতি তিন মাস পরপর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসসহ আয়-ব্যয়ের নানা হিসাব থাকে। শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে ইপিএস খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। কোম্পানিভেদে ইপিএসের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ও ধনাত্মক উভয়ই হতে পারে। ইপিএস প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক মানে হলো ওই কোম্পানির ব্যবসা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ইপিএসের প্রবৃদ্ধি ধনাত্মক মানে হচ্ছে কোম্পানির ব্যবসা ভালো, ভবিষ্যৎ ভালো। ইপিএস প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের অবশ্যই আরও একটি বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে। সেটি হচ্ছে কোম্পানির বিক্রি বাড়ছে কি না। যদি বিক্রি না বেড়ে, খরচ কমে যাওয়ার কারণে ইপিএস বেড়ে যায় তাহলে ওই কোম্পানি নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। এ ছাড়া কোম্পানির বিনিয়োগের তথ্যগুলোও জানুন। যদি দেখেন ভালো কোনো কোম্পানি কোনো শিল্পাঞ্চলে জমি কিনছে তাহলে বুঝতে হবে ওই কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণের চিন্তাভাবনা করছে। আমাদের বাজারে অনেক কোম্পানি আছে যারা টাকাপয়সা নয়-ছয় করতে জমিতে বিনিয়োগ করে। সেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

বিজ্ঞাপন

৩. নেতৃত্ব দেখা খুব জরুরি

যে কোম্পানির শেয়ার কিনছেন, সেই কোম্পানি কারা চালাচ্ছেন, সেই খোঁজখবর নেওয়াটা খুবই জরুরি। কারণ, তাঁদের হাতেই আপনার বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ ও ভালো–মন্দ। আমাদের এখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা শুনে শুনে শুধু কোম্পানির শেয়ার কেনেন। ওই শেয়ারের পেছনের কোম্পানিটি কী বানায়, বিক্রি কেমন, কারা চালায়, কেমন চালায়—এসব কোনো কিছুরই খোঁজখবর বিনিয়োগকারীরা নেন না। সে কারণে দেখা যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মন্দ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে লোকসান গুনছে। মনে রাখতে হবে, ভালো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ একটি খারাপ কোম্পানিকেও অনেক সময় ভালো কোম্পানিতে রূপ দিতে পারে। আবার ব্যবস্থাপনা দক্ষ না হলে ভালো কোম্পানিও অনেক সময় খারাপ হয়ে যায়। তাই শুধু শেয়ার না কিনে, কেনার আগে কোম্পানিটি সম্পর্কে জানুন। আজকাল অনলাইনেই অনেক তথ্য জানা যায়।

৪. বাজারের আচরণ বুঝুন, বয়স বুঝে ঝুঁকি নিন

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে বাজারের আচরণ বোঝাটা খুব জরুরি। কারণ, এই আচরণের ওপর নির্ভর করেই শেয়ারের কেনাবেচা করতে হবে। আমাদের বাজারে বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করেন শেয়ারের দাম বাড়তে থাকলে। অথচ মন্দাবাজারই শেয়ার কেনার জন্য ভালো বাজার। বিশ্বে বিনিয়োগগুরু হিসেবে খ্যাত ওয়ারেন বাফেট বলেছেন, বাজারে সবাই যখন একদিকে ছোটে, সেদিকে না ছুটে উল্টো পথ বেছে নিতে। সবাই যখন শেয়ার কেনায় আগ্রহী হতেন, বাফেট তখন বিক্রি করতেন। আর সবাই যখন বাজার নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করতেন, তখনই বাফেট বিনিয়োগ করতেন। বাজারের আচরণ বোঝার পাশাপাশি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সটাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব বিনিয়োগকারীর বয়স ৪০–এর নিচে, তাঁরা যে ঝুঁকি নিতে পারবেন, ৭০ বছরের একজন বিনিয়োগকারীর সেই ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না। বয়স্কদের বিনিয়োগ করতে হবে কম ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে। যেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ লভ্যাংশ পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে আবার শেয়ারের দামের খুব বেশি হেরফের হবে না। এসব বিনিয়োগকারী হয়তো কম মুনাফা পাবেন কিন্তু ঝুঁকিও কম থাকবে। আবার যাঁদের বয়স কম তাঁরা খুব বেশি দাম ওঠানামা করে এমন শেয়ারে বিনিয়োগ করেও ঝুঁকি নিতে পারেন। তাতে হয় বেশি মুনাফা পাবেন নয়তো লোকসান হবে। কিন্তু বয়সের কারণে সেই লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সময় পাবেন কম বয়সী বিনিয়োগকারীরা। এ ছাড়া যাঁর বিনিয়োগ যত বেশি, তিনি তত বেশি ঝুঁকি নিতে পারবেন। তাই বিনিয়োগের পরিমাণ বুঝে ঝুঁকি নিন।

৫. সুদহারে নজর রাখুন

শেয়ারবাজারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি, অর্থনীতির একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। তার চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যাংকের সুদহারের। ব্যাংকের সুদহার যদি বেড়ে যায় তখন বুঝতে হবে বাজারে তারল্য কমবে। আবার ব্যাংকে সুদহার কমতির দিকে থাকলে বুঝতে হবে শেয়ারবাজারে তারল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সুদহারের দিকে নজর রাখতে হবে। আবার জমির দামের ওঠানামাও অনেক সময় শেয়ারবাজারকে প্রভাবিত করে। জমির দাম বাড়তে থাকলে বুঝতে হবে শেয়ারবাজার থেকেও সেখান অর্থ যাবে। তাই সেই অনুযায়ী আগেভাগে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে হবে। এসব খোঁজখবর রাখার জন্য দরকার আর্থিক জ্ঞান।


আবু আহমেদ: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
শেয়ারবাজার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন