default-image

পাবনার বেড়া উপজেলার চাকলা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমানের ইচ্ছে ছিল অন্যবারের চেয়ে বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করবেন। গত বছরের এক বিঘা জমির জায়গায় এবার আড়াই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু পেঁয়াজবীজের অস্বাভাবিক দাম দেখে তিনি হতাশ। কারণ গতবারের তুলনায় বীজের কেজিপ্রতি দাম এ বছর তিন গুণের বেশি বেড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় উঠে গেছে।

মিজানুর রহমান সম্প্রতি বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়লি সারা দেশে হইচই শুরু হয়। কিন্তু দেড় হাজার টাকা কেজির পেঁয়াজবীজে পাঁচ হাজার টাকা হওয়াতেও কারও কোনো কথা নাই। এত দামে কিনে পেঁয়াজের বীজতলা বানালি নির্ঘাত আমাগরে (কৃষকদের) লোকসান হয়া যাবি। তাই পেঁয়াজ আবাদের সব ইচ্ছা চইল্যা গেছে।’

দেশে পেঁয়াজের ভান্ডার বলে পরিচিত পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার অধিকাংশ চাষিই মিজানুর রহমানের মতো পরপর দুই বছর হঠাৎ দাম বাড়তে দেখে এবারে বেশি জমিতে আবাদের কথা ভাবছিলেন। কিন্তু পেঁয়াজবীজের অগ্নিমূল্যে তাঁরা দোটানায় পড়েছেন, আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় পেঁয়াজের আবাদ হয়ে থাকে দুই পদ্ধতিতে। এর একটি হলো মূলকাটা ও অপরটি হলো হালি। মূলকাটা পদ্ধতিতে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পেঁয়াজের আবাদ করে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে পেঁয়াজ ঘরে তোলা হয়।

পেঁয়াজচাষিরা জানান, গতবারের চেয়ে এবারে পেঁয়াজবীজের দাম কেজিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা বেড়েছে। গত বছর যেখানে প্রতি কেজি বীজ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে এবারে তা সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কৃষকদের অভিযোগ, বীজের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগে বীজ ব্যবসায়ীদের একটি চক্র দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় পেঁয়াজের আবাদ হয়ে থাকে দুই পদ্ধতিতে। এর একটি হলো মূলকাটা ও অপরটি হলো হালি। মূলকাটা পদ্ধতিতে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পেঁয়াজের আবাদ করে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে পেঁয়াজ ঘরে তোলা হয়। এই পদ্ধতিতে গোটা বা অঙ্কুরিত পেঁয়াজ জমিতে রোপণ করা হয়। মূলকাটা পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না।

অন্যদিকে হালি পদ্ধতিতে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে পেঁয়াজের আবাদ করে মার্চ-এপ্রিলে পেঁয়াজ ঘরে তোলা হয়। এই পদ্ধতিতে পেঁয়াজের চারা জমিতে রোপণ করা হয়। হালি পেঁয়াজ দীর্ঘদিন ঘরে সংরক্ষণ করা যায়।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুই উপজেলায় হালি পদ্ধতির পেঁয়াজই বেশি উৎপাদন হয়। হালি ও মূলকাটা মিলিয়ে এবারে সাঁথিয়ায় ১৬ হাজার ৭৫০ হেক্টর ও বেড়ায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাঁথিয়ায় ১৩ হাজার ৭৫০ ও বেড়ায় ৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে হালি পেঁয়াজের আবাদ হওয়ার কথা। মাসখানেকের মধ্যে পেঁয়াজের চারার জন্য বীজতলা তৈরি করতে হবে।

কিন্তু পেঁয়াজবীজের অগ্নিমূল্যের কারণে কৃষকেরা বীজতলা তৈরি নিয়ে চরম সংশয়ে রয়েছেন। চড়া দামের বীজ কিনে পেঁয়াজের আবাদ করলে লাভ হবে কি না, উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, তা ভেবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন কৃষকেরা।

এক বিঘা জমিতে এক কেজি বীজ লাগে। তার মানে গত বছরের তুলনায় এবার শুরুতেই পেঁয়াজ আবাদের খরচ বিঘায় সাড়ে তিন হাজার টাকা বাইড়্যা গেল।
সাঁথিয়ার শহীদনগর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম

সাঁথিয়ার বনগ্রাম বাজারের বীজ বিক্রেতা ইয়াসিন আলী ও বেড়ার নলভাঙ্গা গ্রামের মৌসুমি বীজ বিক্রেতা আরব আলী জানান, এবার পেঁয়াজবীজের চাহিদা বেশি, কিন্তু সরবরাহ খুব কম। রাজশাহী ও ফরিদপুরের পেঁয়াজবীজের মোকামে গিয়ে বেশি দামে বীজ কিনতে হচ্ছে। সামনে দাম আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় অনেক কৃষক এখন থেকেই পেঁয়াজের বীজ কিনে রাখছেন।

সাঁথিয়ার শহীদনগর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে এক কেজি বীজ লাগে। তার মানে গত বছরের তুলনায় এবার শুরুতেই পেঁয়াজ আবাদের খরচ বিঘায় সাড়ে তিন হাজার টাকা বাইড়্যা গেল। বার বেশি জমিতে পেঁয়াজ আবাদের ইচ্ছা থাকলেও সাহস হতেছে না।’

বিজ্ঞাপন
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাঁথিয়া ও বেড়ার বেশির ভাগ পেঁয়াজবীজের চাহিদা রাজশাহী ও ফরিদপুর থেকে পূরণ হয়ে থাকে। তবে দুই উপজেলায় স্থানীয়ভাবেও কিছু বীজ উৎপাদন হয়। এবার সাঁথিয়ায় ১০৩ টন ও বেড়ায় ২৩ টন পেঁয়াজবীজের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে গত মৌসুমে সাঁথিয়ায় সাড়ে ১৫ টন ও বেড়ায় ১৮ টন বীজ উৎপাদিত হয়েছে।

সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জীব কুমার গোস্বামী ও বেড়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আজমত আলী সম্প্রতি প্রথম আলোকে জানান, গত বছর শিলাবৃষ্টি হওয়ায় মাঠে থাকা অবস্থায় বীজের জন্য রাখা পেঁয়াজগাছ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার অনেক কৃষক বেশি দাম দেখে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিয়েছেন, বীজের জন্য রাখেননি। সে জন্য সারা দেশেই গতবার পেঁয়াজবীজের উৎপাদন কম হয়েছে।

শেয়ারবাজার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন