default-image

শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির তদন্তে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটির বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকালবুধবার বিএসইসির পক্ষ থেকে আলাদাভাবে এ–সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের তদন্তসংক্রান্ত ১২ জানুয়ারির নির্দেশনাটির কার্যকারিতা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হলো। গত মঙ্গলবার যিনি এ তদন্তসংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছিলেন, গতকাল তিনিই কার্যকারিতা স্থগিতের নির্দেশনা দেন।

গত মঙ্গলবার সিকিউরিটিজের তদন্তসংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি হয়। এতে বলা হয়, শেয়ারবাজারে এক মাসে যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে বা কমেছে, সেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে শেয়ারবাজারে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তাতে গতকাল শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯১ পয়েন্ট বা প্রায় দেড় শতাংশের মতো কমেছে। বাজারের এ পতনের পর গতকাল বিকেলে তদন্তসংক্রান্ত নির্দেশনার কার্যকারিতা পিছিয়ে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবারের নির্দেশনায় বিএসইসি বলেছিল, শেয়ারবাজারে যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম এক মাসে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বা কমেছে, তার পেছনে কোনো কারসাজি রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা হবে। পাশাপাশি কোনো কোম্পানির এক মাসের গড় লেনদেন আগের ছয় মাসের গড় লেনদেনের চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি বাড়লে সেই কোম্পানির শেয়ার নিয়েও তদন্ত হবে।

এ ছাড়া কোনো কোম্পানির বার্ষিক বা প্রান্তিক শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশের বেশি তারতম্য ঘটলে এবং মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা পিএসআই প্রকাশের আগের ১০ কার্যদিবসে দাম ও লেনদেন ৩০ শতাংশের কমবেশি হলে, সেসব কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন নিয়েও তদন্ত করবে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যপতনের তদন্তের জন্য এ চার পন্থা নির্ধারণ করে দেয় বিএসইসি। এসব পন্থা অনুসরণ করে নিয়মিতভাবে স্টক এক্সচেঞ্জকে তদন্তের কথা বলা হয়েছিল।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির গতকালের সভায় মার্জিন ঋণের সুদ সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

ঋণের সুদ হার বেঁধে দেওয়া হলো

শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের সিদ্ধান্তে ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে বেঁধে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু করোনা এসে সবকিছু ওলট–পালট করে দিয়েছি। তাই ব্যাংকঋণের সুদ কমার পরও শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারেননি। শিল্পে বিনিয়োগ না হওয়ায়, ব্যবসা–বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ শেয়ারবাজারমুখী হয়। তাতে করোনার মধ্যেও তরতর করে বাড়তে থাকে সূচক ও লেনদেন।

এ অবস্থায় ব্যাংকের মতো শেয়ারবাজারের মার্জিন ঋণের সুদহারও প্রথমবারের মতো বেঁধে দিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আর তাতে কিছুটা স্বস্তি মিলবে ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের। আবার নতুন করে ঋণ করে শেয়ার কেনার প্রবণতাও বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। কারণ, মার্জিন ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ। গতকাল বুধবার বিএসইসির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শেয়ারবাজারে ঋণদাতা একাধিক মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেয়ারের বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের বর্তমান সুদহার প্রতিষ্ঠানভেদে ১২–১৫ শতাংশ পর্যন্ত। তবে চক্রবৃদ্ধি হিসাবের কারণে শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সুদহার বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। শেয়ারবাজারে সুদের হিসাব কষা হয় দিনের হিসাবে। যখন কোনো বিনিয়োগকারী শেয়ারের বিপরীতে ঋণ নেন, তখন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে ওই বিনিয়োগকারীর শেয়ারের পোর্টফোলিও বা পত্রকোষ জিম্মায় থাকে।

নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারের দাম নির্দিষ্ট একটি সীমার নিচে নেমে গেলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রি (ফোর্সড সেল) করে দিয়ে ঋণ সমন্বয় করে। আর বাজারে শেয়ারের দাম বাড়তে থাকলে তাতে ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও বেড়ে যায় প্রতিদিন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে বিএসইসি বলছে, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যে সুদে টাকা ধার নেবে, তার সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ বাড়তি সুদ যোগ করতে পারবে মার্জিন ঋণের ক্ষেত্রে। তবে মার্জিন ঋণের এ সুদহার কোনোভাবেই ১২ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

গত এপ্রিলে ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নেমে আসার পর থেকে শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণের সুদ কমানোর দাবি ওঠে। এর মধ্যে গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ ছিল। এ বন্ধের মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের ঋণের সুদ বেড়েছে চক্রবৃদ্ধি হারে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে ১: ০.৫ হারে মার্জিন ঋণসুবিধা বলবৎ রয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিনিয়োগকারী ঋণযোগ্য শেয়ারে নিজে ১০০ টাকা বিনিয়োগ করলে তার বিপরীতে ৫০ টাকা ঋণসুবিধা পান। বিনিয়োগকারীরা বাড়তি মুনাফার আশায় এ ঋণসুবিধা নিয়ে থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এ ঋণের কারণেই নিজের পুঁজিও হারাতে হয় বিনিয়োগকারীদের। ২০১০ সালের শেয়ারবাজারে ধসের পর বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী মার্জিন ঋণের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে বাজার ছেড়েছেন। বিপুল পরিমাণ অনাদায়ি ঋণ নিয়ে এখনো হিমশিম খাচ্ছে শেয়ারবাজারের অনেক প্রতিষ্ঠান। ২০১০ সালের কেলেঙ্কারির পর এখনো কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ি রয়ে গেছে।

মন্তব্য করুন