default-image

বাতেন মিয়া একটি সরকারি সংস্থার নিরাপত্তারক্ষী। অবৈধ উপার্জনের বিপুল পরিমাণ টাকা নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা আছে। বাসায় ‘বালিশের নিচে’ আছে আরও অর্থ। একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিকানা, আছে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ। নিজেও বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। এসব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের কোনো কিছুই আয়কর নথিতে দেখানো নেই।

এবার অবশ্য বাতেন মিয়ার চিন্তা কম। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সব অবৈধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বৈধ করার অবাধ সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের কোটি টাকার ফ্ল্যাটটি মাত্র ৭ লাখ টাকা কর দিয়ে বৈধ করতে পারবেন। অথচ বৈধ আয়ে এই ফ্ল্যাট কিনলে দিতে হতো ২৫ লাখ টাকা কর। কালোটাকার মালিক হওয়ায় সরাসরি লাভ হবে ১৮ লাখ টাকা।

চলতি অর্থবছরে এভাবেই বিস্তৃত পরিসরে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত আয়কর পরিপত্রে কীভাবে, কোন খাতের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বা নগদে থাকা কালোটাকা সাদা করা যাবে, তা বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানেই কালোটাকা সাদা করার এসব তথ্য জানা যাচ্ছে। বাজেট বক্তৃতায় এর বিস্তারিত উল্লেখ ছিল না।

বিজ্ঞাপন

সুযোগ ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত

কালোটাকা দিয়ে জমি ও ফ্ল্যাট কেনা হলে তা দেখানোর সুযোগ ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। অতীতে কেউ যদি ঘুষ-দুর্নীতির টাকা দিয়ে জমি ও ফ্ল্যাট কিনে থাকেন, কিন্তু আয়ের সঙ্গে সংগতি না থাকায় এত দিন বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে তা দেখাননি, তাঁদের জন্য এ সুযোগ। চলতি বছরে আয়কর নথি জমার সময় এলাকাভেদে প্রতি বর্গমিটারে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলেই ওই সম্পদ বৈধ করে দেবে এনবিআর। বাণিজ্যিক ভবন বা স্পেস কেনার ক্ষেত্রেও এ সুযোগ থাকবে।

একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ২০১৫ সালে জনৈক নিয়াজ মোর্শেদ (ছদ্মনাম) মিরপুরে ১০ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। অবৈধ অর্থে কেনা ওই জমি আয়কর নথিতে দেখাননি। নতুন নিয়মে এখন যত টাকায় জমি কেনা হোক না কেন, প্রতি বর্গমিটারে ৫ হাজার টাকা কর দিলেই কর নথির বিবরণীতে তা ‘সাদা’ হয়ে যাবে। এনবিআরের হিসাবে, তাঁকে ১০ শতক জমির জন্য সব মিলিয়ে ২০ লাখ ২৩ হাজার ৪৩০ টাকা কর দিলেই হবে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ওই করদাতা নিজের বার্ষিক আয়কর নথির সম্পদের বিবরণীতে ওই জমি দেখিয়ে দেবেন। ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

একইভাবে বার্ষিক রিটার্ন জমার আগেই ১০ শতাংশ কর দিয়ে নগদ টাকাও সাদা করা যাবে। শুধু কর রিটার্নে ঘোষণা করতে হবে কত টাকা সাদা করা হলো আর কত কর দেওয়া হলো। শুধু বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে ‘অন্যান্য খাতের আয়’ হিসেবে দেখালেই হবে। এর মানে, ঘুষ বা অবৈধ আয় উপার্জনকারীদের টাকার উৎস দেখাতে হচ্ছে না। দুর্নীতির অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ঠিকাদার, রাজনীতিবিদদের বাসা থেকে বিপুলসংখ্যক নগদ টাকা উদ্ধার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ সুযোগ তাঁদের জন্যও।

আবার অবৈধভাবে উপার্জিত টাকা নগদে রাখতে চান না। বেনামে ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব বা স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে টাকা জমিয়ে রাখেন। তা–ও বৈধ হবে ১০ শতাংশ করে।

বিকল্প সুযোগ

৩০ নভেম্বর রিটার্ন জমার সময়ের পর যদি কোনো করদাতা কালোটাকায় ফ্ল্যাট ও জমি কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, সেই ইচ্ছাও পূরণ হবে। প্রথমে নগদ বা ব্যাংকে থাকা অবৈধভাবে উপার্জিত টাকা ১০ শতাংশ কর দিয়ে সাদা করতে হবে। পরে সেই টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট-জমি কেনা যাবে। এভাবে পদে পদে কালোটাকা ব্যবহারের অবাধ সুযোগ বাড়ানো হলো।

যাঁরা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাঁরা নিরুৎসাহিত হন। বরং যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। অন্যদিকে কালোটাকার মালিকদের বারবার অপেক্ষাকৃত কম কর হারে টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান

বছর দুয়েক আগে সেরা করদাতা হিসেবে এনবিআরের কর কার্ড পেয়েছিলেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও এ কে খান গ্রুপের পরিচালক আবুল কাসেম খান। কালোটাকা সাদা করার অবাধ সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনোভাবেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। যাঁরা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাঁরা নিরুৎসাহিত হন। বরং যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। অন্যদিকে কালোটাকার মালিকদের বারবার অপেক্ষাকৃত কম কর হারে টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে অবৈধভাবে উপার্জনকারী দুর্নীতি করতে আরও উৎসাহ পান। তাঁরা ভাবেন, অবৈধ টাকা সাদা করার সুযোগ তো আসবেই।’

বিজ্ঞাপন

সুযোগ দিয়েছে সব সরকারই

সব সরকারই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। কখনো বিনিয়োগ করলে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, কখনো শেয়ারবাজারে গেলেও সুযোগ মিলেছে। আবার কখনো নগদ টাকাও সাদা করার সুযোগ পেয়েছেন অবৈধভাবে উপার্জনকারী করদাতারা। তবে নজিরবিহীনভাবে প্রায় সব খাতেই এ সুযোগ দেওয়া হলো এবারই। এত দিন শুধু বলা হতো এনবিআর আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করবে না। এবার বলা হয়েছে, আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষও প্রশ্ন করবে না। এর মানে, দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) কীভাবে কালোটাকার মালিক হলেন, তা প্রশ্ন করতে পারবে না।

ঢালাওভাবে কালোটাকার সুযোগ দিয়ে অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, যা দুর্নীতি–সহায়ক। এ ছাড়া এটি অসাংবিধানিক। সংবিধানে কালোটাকাকে অবৈধ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান

এ ধরনের সুযোগ দেওয়াকে ‘হতাশাব্যঞ্জক’ বলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ঢালাওভাবে কালোটাকার সুযোগ দিয়ে অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, যা দুর্নীতি–সহায়ক। এ ছাড়া এটি অসাংবিধানিক। সংবিধানে কালোটাকাকে অবৈধ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বৈধভাবে উপার্জনকারীদের প্রতি ন্যায়বিচার করা হচ্ছে না। ফ্ল্যাট, জমিসহ যেসব খাতে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, ওই খাতগুলো কালোটাকার মালিকদের হাতে চলে যাবে। সৎ উপায়ে উপার্জনকারীরা এসব খাতে ঢুকতে পারবেন না।

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বারবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এতে রাষ্ট্র ইতিবাচক ফল পায় না। কিছু কিছু মানুষের অবৈধ সম্পদকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বারবার এ সুযোগ দেওয়া হয়।

বারবার কালোটাকার সুযোগ

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় সব সরকারই এ সুযোগ দিয়ে আসছে। কালোটাকার সাদা হয়েছে খুব সামান্যই। অর্থনীতিবিদেরা বরাবরই বলে আসছেন, কালোটাকা সাদা করা নয়, বরং কালোটাকার উৎস বন্ধ করাই মূল কাজ হওয়া উচিত।

২০০৯ সালের ১২ জুন বাজেট–পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত নিজেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে একে ‘রাজনীতির কাছে নৈতিকতার পরাজয়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। তারপরও এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ সমঝোতা। কেননা, রাজনীতি হলো আপসের সবচেয়ে নিপুণ কৌশল। রাজনীতিতে সব ধরনের মানুষ ও সব ধরনের স্বার্থকে সমন্বয় করে চলতে হয়।’

দেখা যাচ্ছে, কয়েক বছর ধরেই ফ্ল্যাট কেনায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবমতে,

  • তিন অর্থবছরে মোট ২২৩ জন ব্যক্তি কালোটাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন।

  • ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৮ জন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯০ জন এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮৫ জন করদাতা তাঁদের রিটার্নে কালোটাকায় ফ্ল্যাট কেনার ঘোষণা দিয়েছেন।

  • ২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসাব পাওয়া যায়নি।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সব মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি সাদা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ওই সময় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ সুযোগ নিয়েছিল। এরপর বর্তমান সরকারের আমলেও একাধিকবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তেমন একটা সাড়া পাওয়া যায়নি।
১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে শেয়ারবাজারে কালোটাকা বিনিয়োগ করা যাবে। যে শেয়ার কেনা হবে, তা এক বছর বিক্রি করা যাবে না। গত ১ জুলাই থেকে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বিনিয়োগ করতে হবে।

শেয়ারবাজারে অবাধ সুযোগ

শেয়ারবাজারে কালোটাকা সাদা করার অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন শেয়ার কিনে যেমন কালোটাকা সাদা করা যাবে, তেমনি অতীতে অর্থাৎ কয়েক বছর আগে কালোটাকায় শেয়ার কেনা থাকলেও তা সাদা করা যাবে।

বাজেট ঘোষণার পর প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে শেয়ারবাজারে কালোটাকা বিনিয়োগ করা যাবে। যে শেয়ার কেনা হবে, তা এক বছর বিক্রি করা যাবে না। গত ১ জুলাই থেকে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বিনিয়োগ করতে হবে। কালোটাকায় শেয়ার কেনার পর এক মাসের মধ্যে এনবিআরের নির্দিষ্ট ফরমে শেয়ারের যাবতীয় তথ্য দিতে হবে। ওই ফরমে কালোটাকার মালিকেরা কবে থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছেন, অতীতে কোন কোন কোম্পানির শেয়ার কিনেছিলেন, এখন কোন কোন কোম্পানির শেয়ার আছে, এ পর্যন্ত কত টাকা বিনিয়োগ করেছেন—এসব তথ্য দিতে হবে।

গত সপ্তাহে প্রকাশিত চলতি অর্থবছরের আয়করসংক্রান্ত পরিপত্রে শেয়ারবাজারে কালোটাকা সাদা করার আরও বিস্তৃত সুযোগের কথা জানা গেছে। পরিপত্রের একটি অংশে উদাহরণসহ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে কালোটাকায় শেয়ার কেনেন, তা ১০ শতাংশ কর দিলেই সাদা হয়ে যাবে। তবে লক ইন বা এক বছর বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়নি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন