শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইমাম বাটন একে তো লোকসানি প্রতিষ্ঠান, চার বছর ধরে লভ্যাংশ দিতে পারেনি, তার ওপর কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। এই যখন অবস্থা, তখন কোম্পানিটি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। তা সত্ত্বেও সাত কার্যদিবস ধরে এটির শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বাড়ছে।
কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম সাত কার্যদিবসে প্রায় সাড়ে পাঁচ টাকা বেড়েছে। ৫ ফেব্রুয়ারি এর প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল প্রায় আট টাকা। গতকাল রোববার তা ১৩ টাকা ৩০ পয়সায় উঠেছে। এর মধ্যে নতুন সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে গতকাল শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ বা ১ টাকা ২০ পয়সা।
কোম্পানিটির শেয়ারদর অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এখনো নীরব রয়েছে।
তবে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। চিঠির জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার মতো অপ্রকাশিত কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য তাদের কাছে নেই। গতকাল সকালে এ বক্তব্য ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। তার পরও কোম্পানিটির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।
আর্থিক দুর্বলতার কারণে বেশ কয়েক বছর কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিতে পারছে না। এমনকি এটির শেয়ারের বিপরীতে আয় বা ইপিএসও ঋণাত্মক। এ কারণে ইমাম বাটনকে স্টক এক্সচেঞ্জের দুর্বল বা জেড শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।
গত নভেম্বরে আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে কোম্পানিটি সম্পর্কে বেশ কিছু মূল্যায়ন বা মতামত দিয়েছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আনিসুর রহমান অ্যান্ড কোম্পানি। তাতে বলা হয়, কোম্পানিটি তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ২১ শতাংশ ব্যবহার করতে পেরেছে। উৎপাদন যন্ত্রপাতির কারিগরি সমস্যা, পণ্যের বাজার চাহিদা ও ক্রমাগত বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে বছরজুড়ে এটির উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এ সংকট কাটাতে না পারলে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়তে বা ধাক্কা খেতে পারে বলে সতর্কবার্তা দেয় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতামতে আরও বলা হয়, উৎপাদন ক্ষমতার ৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে না পারলে এটির পরিচালনা টেকসই হবে না। ২০১৪ সালের জুনে সমাপ্ত আর্থিক বছর শেষে কোম্পানিটির পরিচালনগত ক্ষতি বা লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এদিকে গত ডিসেম্বর শেষে অর্ধবার্ষিক অনিরীক্ষিত যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী লোকসানের পরিমাণ দেখানো হয় প্রায় ৫৭ লাখ টাকা। উল্লিখিত সময়ে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৪) শেয়ারপ্রতি ৭৪ পয়সা করে লোকসান দিয়েছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক বোতাম উৎপাদনকারী কোম্পানি ইমাম বাটন ১৯৯৬ সালে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ২০১১ সাল থেকে কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দেয়নি। ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধনের এ কোম্পানির মোট শেয়ারের সংখ্যা ৭৭ লাখ। যার মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে রয়েছে বাকি ৩৫ শতাংশ শেয়ার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোম্পানিটির বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ রয়েছে। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। এমনকি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
কোম্পানিটির সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় অস্বাভাবিক এ মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ডিন মোহাম্মদ মূসা প্রথম আলোকে বলেন, কোম্পানিটির সার্বিক অবস্থা ও নিরীক্ষকদের মতামতের পর এমন মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ হতে পারে কারসাজি। যে কোম্পানি শেয়ারধারীদের ঠিকমতো লভ্যাংশ দিতে পারে না, লোকসানে চলছে এবং যেটির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে, তেমন একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ থাকতে পারে না। কারসাজি চক্রের কেউ হয়তো এটির দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আর এতে যদি কোনো সাধারণ বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হন, তাহলে তা ক্ষতির কারণ হবে। তাই শেয়ারটি কেনার ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

বিজ্ঞাপন
শেয়ারবাজার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন