বিজ্ঞাপন

লভ্যাংশ ঘোষণার কারণে গতকাল সোমবার সোনালী ইনস্যুরেন্সের শেয়ারের দামের উত্থান–পতনে কোনো সীমা (সার্কিট ব্রেকার) ছিল না। এ সুবাদে আগের দিনের ১৬ টাকার শেয়ারের লেনদেন শুরু হয় ৬০ টাকায়। দিন শেষে সেই দাম আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা। তাতে এক দিনে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৭০ টাকা ৫০ পয়সা বা ৪৪১ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু শেয়ারের দামের বেঁধে দেওয়া সীমা বা সার্কিট ব্রেকারের নিয়ম অনুযায়ী, এক দিনে একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে লভ্যাংশ ঘোষণার পর প্রথম লেনদেনের দিনে এ সীমা উন্মুক্ত থাকে, অর্থাৎ শেয়ারের দামে কোনো সার্কিট ব্রেকার থাকে না।

সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের দামেও গতকাল সোমবার কোনো সার্কিট ব্রেকার ছিল না। এর ফলে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এদিন ১৫ মিনিটের প্রি–লেনদেনকালীন দেখা যায়, ১ হাজার ৫০ টাকায় কোম্পানিটির ১০টি শেয়ারের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়। আবার একইভাবে মাত্র ১০ পয়সায় ১ হাজার ৬৫৬টি শেয়ারের বিক্রয়াদেশ দেওয়া হয়। যদিও এ ক্রয়াদেশ বা বিক্রয়াদেশের কোনোটিই কার্যকর হয়নি। কারণ, আদেশ দুটিই ছিল ‘অস্বাভাবিক’। দিনের শুরুতে শেয়ারের দাম বাড়াতে অস্বাভাবিক ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়। লেনদেন শুরুর আগে আগে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এভাবে দিনের শুরুতেই কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইদানীং এ ধরনের প্রবণতা বেশ বেড়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শেয়ারের ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীর বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাবে ক্রয়ক্ষমতা বা যে পরিমাণ শেয়ার কিনতে চান, সে পরিমাণ টাকা থাকতে হয়। একইভাবে যে পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে চান, সেই পরিমাণ শেয়ার বিও হিসাবে থাকতে হবে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় এ নিয়ম না মেনে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারের দামকে প্রভাবিত অস্বাভাবিক ক্রয়াদেশ বা বিক্রয়াদেশ দেন।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, শুধু দিনের লেনদেন শুরুর ক্রয় বা বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে ভুয়া আদেশের ঘটনা বেড়েছে তা নয়, স্বাভাবিক লেনদেন চলাকালেও শেয়ারের দাম বাড়াতে বা কমাতেও ভুয়া আদেশের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের চোখ ফাঁকি দিতেই কারসাজিকারীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কোনো একটি কোম্পানির ৫ হাজার শেয়ার বিক্রেতা ৪০ টাকায় বিক্রি করতে চাচ্ছেন। সেই শেয়ারের ক্রেতা আছে ৩৯ টাকা ৯০ পয়সায়। মাঝে ১০ পয়সার ব্যবধান। এখন কোনো কারসাজিকারী শেয়ারটির দাম বাড়াতে চান। তখন তিনি কিছু কৌশলের আশ্রয় নেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করতে ভুয়া ক্রয়াদেশ দেন। ৩৯ টাকা ৯০ পয়সায় যে ক্রেতা ৫ হাজার শেয়ার কেনার ক্রয়াদেশ দিয়েছেন, তাঁর সেই ক্রয়াদেশের নিচে লেনদেনযন্ত্রে ৩৯ টাকা ৫০ পয়সায় এক লাখ শেয়ারের ক্রয়াদেশ বসিয়ে দেন ওই কারসাজিকারী। ওই দিকে বিক্রেতা যখন লেনদেনযন্ত্রে দেখেন মাত্র ৫০ পয়সার ব্যবধানে বিপুল শেয়ারের ক্রেতা রয়েছেন, তখন বিক্রেতাও শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দেন। অন্যদিকে বিপুল শেয়ারের ক্রেতা দেখেন, নতুন করে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী শেয়ারটি বেশি দামে কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তখন শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করে। আর সুযোগ বুঝে ওই কারসাজিকারী তাঁর ক্রয়াদেশ তুলে নেয়। এভাবে দাম বাড়ানোর একপর্যায়ে আগে থেকে নিজের হাতে থাকা বিপুল শেয়ার বেশি দামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দেন কারসাজিকারীরা।

এভাবে দাম বাড়াতে ভুয়া আদেশ দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বোকা বানানোর ঘটনা ইদানীং বেশ বেড়ে গেছে। আইনে এ ধরনের প্রবণতাকে ‘কারসাজি’ হিসেবে চিহ্নিত এবং কারসাজিকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও বিধান রয়েছে। আবার কারসাজি ধরতে স্টক এক্সচেঞ্জের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থায়ও রয়েছে অত্যাধুনিক সার্ভেইল্যান্স বা তদারকি ব্যবস্থা। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় এ ধরনের কারসাজি কতটা ধরা পড়ছে বা যাঁরা সেটি ধরার দায়িত্বে, তাঁরা তা দেখছেন কি না, এ নিয়েই এখন প্রশ্ন রয়েছে বাজারে। যদিও মুখ খুলে কেউ কিছু বলছে না।

এদিকে ভুয়া ক্রয়াদেশ ও বিক্রয়াদেশ দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় গতকাল সোমবার বিএসইসির উপপরিচালক ওয়ারিসুল হাসানকে দিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সসহ সাম্প্রতিক সময়ের অস্বাভাবিক ক্রয়াদেশ ও বিক্রয়াদেশের ঘটনা তদন্ত করে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

শেয়ারবাজার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন