default-image

আপনি যখন আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে থাকেন কিংবা বেকার হয়ে যান বা আপনার আয় কমে যায়, তাহলে সংসার চালাতে কী করবেন? লোকলজ্জার কারণে আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পাতার আগে নিঃসন্দেহে জমানো টাকায় হাত দেবেন। দুঃসময়ের জন্য হয়তো সঞ্চয়পত্র কিনেছেন কিংবা ডিপিএস করেছেন। অনেকে নগদ টাকাও জমিয়েছেন। এবার করোনায় লাখ লাখ পরিবারের কর্তাদের সেই সঞ্চয় ভাঙতে হয়েছে।

করোনাকালে আর্থিক সংকটে পড়া পরিবারগুলোর অর্ধেকই সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছে। দুঃসময়ের জন্য রাখা সঞ্চয়ের টাকায় হাত দিতে বাধ্য হয়েছেন কর্তারা। করোনা সংকটে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারই কোনো না কোনোভাবে আর্থিক টানাপোড়েনে পড়েছে। কারণ, মার্চে করোনা শুরুর প্রথম তিন-চার মাসে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হন। তখন বেকারত্ব ১০ গুণ বেড়ে যায়।

এই হিসাব খোদ সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। সম্প্রতি সংস্থাটি ‘কোভিড-১৯ বাংলাদেশ: জীবিকার ওপর অভিঘাত ধারণা জরিপ’ প্রকাশ করেছে। সেই জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, করোনার সময়ে আর্থিক সংকটে পড়া ৪৬ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবার জমানো টাকা খরচ করে সংসার চালিয়েছে। আর ৪৩ শতাংশের বেশি পরিবার আত্মীয়স্বজনের সাহায্য–সহায়তায় টিকে ছিলেন। মাত্র ২১ শতাংশ পরিবার সরকারি ত্রাণ বা অনুদান পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

গত ১৩ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এই জরিপ করেছে। করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানার বাধ্যবাধকতা থাকায় বিবিএস প্রথমবারের মতো টেলিফোনে জরিপটি করে। গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটক—এই চার কোম্পানির মুঠোফোন ব্যবহারকারী ৯৮৯ জন জরিপে অংশ নেন।এরপর তাঁদের উত্তরের ভিত্তিতে জরিপের ফলাফল তৈরি করা হয়।

বিবিএসের জরিপে কোভিড–১৯ মহামারির কারণে আর্থিক সমস্যায় থাকা পরিবারগুলো কীভাবে সংকট মোকাবিলা করেছে, এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে উত্তরদাতারা জানান, মোটাদাগে আটটি উপায়ে সংসার চালিয়েছেন তাঁরা। সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সহায়তা কিংবা সরকারি ত্রাণ বা অনুদান পাওয়া ছাড়াও আরও ছয়টি পথে জীবন যাপন করেছেন। প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার স্থানীয় পর্যায়ে বেসরকারি ঋণ নিয়ে সংসার চালিয়েছে। জমি বা অন্য কোনো স্থায়ী সম্পদ বিক্রি বা বন্ধক রেখে টাকার সংস্থান করেছেন ১১ শতাংশ পরিবারের কর্তা।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পেয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ পরিবার। খোলাবাজারে বিক্রি বা ওএমএসের কম দামের চাল, ডাল কিনে খাবার জোগাড় করেছে সাড়ে ৬ শতাংশ পরিবার।

জরিপে অংশ নেওয়া ৫২ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, আয় কমে যাওয়ায় ওই চার মাসে তাঁরা আগের চেয়ে কম খাবার খেয়েছেন। আর প্রায় ৪৬ শতাংশ পরিবার খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমায়নি। অবশ্য প্রায় ২ শতাংশ পরিবার আগের চেয়ে বেশি খাবার খেয়েছে।

বিবিএসের জরিপের ফলাফলের বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে পুরোনো দরিদ্রদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু করোনার কারণে নতুন দরিদ্রদের জন্য কোনো কর্মসূচি নেই।

সরকারের সে ধরনের প্রস্তুতিও ছিল না কিংবা বড় ধরনের সহায়তা কর্মসূচি চালুর মতো আর্থিক সামর্থ্যও নেই। সরকারি সহায়তা অপ্রতুল ছিল বলেই আর্থিক সমস্যায় পড়া পরিবারগুলো স্বাভাবিকভাবে নিজেদের সঞ্চয় ভেঙেছে। অনেকে আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পেতেছেন। কেউ কেউ সরকারি ত্রাণসহায়তা পেয়েছেন।

বাংলাদেশে গত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত দরিদ্র পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৫২ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, আয় কমে যাওয়ায় ওই চার মাসে তাঁরা আগের চেয়ে কম খাবার খেয়েছেন। আর প্রায় ৪৬ শতাংশ পরিবার খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমায়নি। অবশ্য প্রায় ২ শতাংশ পরিবার আগের চেয়ে বেশি খাবার খেয়েছে।

জানতে চাইলে বিবিএসের এই জরিপের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, করোনাকালে খানা বা পরিবারগুলো কেমন সমস্যায় পড়েছিল, তারা কীভাবে সমস্যা মোকাবিলা করেছে, তা জানতেই জরিপটি করা হয়েছে। আর্থিক সমস্যা সমাধানে সংসার চালাতে অনেকে একাধারে সঞ্চয় ভেঙেছেন, আত্মীয়স্বজনের সহায়তা পেয়েছেন, আবার সরকারি ত্রাণ বা অনুদানও নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
বিবিএসের ভাষায় খানা বা পরিবার বলতে বোঝায়, এক চুলায় যাদের খাবার রান্না করা হয়। এবার দেখা যাক, করোনাকালে কোন ধরনের খানায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছিল। খানাপ্রধানের পেশাভিত্তিক পরিচয় হিসেবে বিবিএসের জরিপে শীর্ষে আছে ছাত্র। এর মানে, যেসব খানার প্রধান ছাত্র, সেসব খানায় আর্থিক সমস্যা বেশি হয়েছে।

বিবিএসের ভাষায় খানা বা পরিবার বলতে বোঝায়, এক চুলায় যাদের খাবার রান্না করা হয়। এবার দেখা যাক, করোনাকালে কোন ধরনের খানায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছিল। খানাপ্রধানের পেশাভিত্তিক পরিচয় হিসেবে বিবিএসের জরিপে শীর্ষে আছে ছাত্র। এর মানে, যেসব খানার প্রধান ছাত্র, সেসব খানায় আর্থিক সমস্যা বেশি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় মেস করে থাকেন, অনেকে টিউশনি করে সংসার চালান, এমন প্রায় ৮৬ শতাংশ পরিবারে দুর্গতি নেমে এসেছে। আর ৮৫ শতাংশ রিকশা-ভ্যানচালক পরিবার–পরিজন নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। আর দিনমজুর-শ্রমিকদের ৮৪ শতাংশ আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

বিবিএসের জরিপ আরও বলছে, করোনায় পরিবার প্রতি আয় কমেছে গড়ে ২০ শতাংশ। করোনার আগে গত মার্চে প্রতি পরিবারে মাসিকগড় আয় ছিল ১৯ হাজার ৪২৫ টাকা। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪৯২ টাকা। ৪ মাসের ব্যবধানে দেশে বেকারের সংখ্যা ১০ গুণ বেড়েছে। গত জুলাই মাসে বেকারত্বের হার ছিল ২২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরে তা পৌনে ৪ শতাংশে নেমে আসে।

মন্তব্য পড়ুন 0