বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আয়কর ফাইল ত্রুটিপূর্ণ হলে তাঁর সার্বিক ক্ষেত্রেই অসুবিধায় পড়তে হতে পারে। আমরা জমি, ফ্ল্যাট, স্থায়ী আমানত বা এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, ইত্যাদির দলিল বা নথি যেভাবে সংরক্ষণ করি, প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় আয়করের ফাইল সেভাবে অনেকেই সংরক্ষণ করেন না। আয়কর ফাইল সঠিকভাবে রাখা করব্যবস্থাপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার অনেকের পক্ষেই কিন্তু আয়কর অধ্যাদেশ, প্রজ্ঞাপন, অর্থ আইন, আয়কর পরিপত্র বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা খুবই কঠিন।

আয়কর আইন প্রতিবছর সংশোধন ও পরিমার্জন হয়। তবে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা, যাঁরা চাকরিজীবী বা ছোটখাটো ব্যবসা করেন, তাঁদের জন্য খুব একটা অসুবিধা হয় না। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই একটু সচেতন হতে হবে। এ বছর যেহেতু ৩০ জুন ২০২১-এর আগে যাঁরা টিআইএন গ্রহণ করেছেন, তাঁদের আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। আবার এ বছর ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাকে অনলাইনে আয়কর জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু আছে। সেই সঙ্গে যাঁদের মোট পরিসম্পদ ৪০ লাখ টাকার নিচে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা শুধু এক পাতার ফরম পূরণ করে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন।

এখনো প্রায় পুরো নভেম্বর মাস সময় আছে রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য। যাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন না, তাঁরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত ফরমে সময় বাড়ানোর আবেদন করতে পারবেন। তবে ২ শতাংশ হারে বিলম্ব সুদ আরোপযোগ্য হবে। এ ক্ষেত্রে উপকর কমিশনার দুই মাস এবং পরবর্তী সময়ে যুগ্ম বা অতিরিক্ত কর কমিশনার আরও দুই মাস সময় মঞ্জুর করতে পারবেন। তবে অবশ্যই করদাতাকে তার যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী জরিমানা আরোপ হবে।

ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে পুরুষ করদাতার ক্ষেত্রে তিন লাখ টাকা, নারী অথবা ৬৫ বছরের অধিক পুরুষ করদাতার ক্ষেত্রে সাড়ে তিন লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী করদাতার ক্ষেত্রে সাড়ে চার লাখ টাকা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। আবার কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা–মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের জন্য করমুক্ত সীমা ৫০ হাজার টাকা বেশি হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা ও মাতা উভয়েই করদাতা হলে যেকোনো একজন এ সুবিধা ভোগ করবেন। আয় নির্ধারিত সীমার নিচে হলে করদাতাকে আয়কর রিটার্ন দিতে হবে, কিন্তু আয়কর দিতে হবে না। শুধু করসীমা অতিক্রম করলেই আয়কর দিতে হবে। অর্থাৎ করসীমার ওপর এক টাকার বেশি হলেও তাঁকে ন্যূনতম আয়কর দিতে হবে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার পাঁচ হাজার টাকা, অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার চার হাজার টাকা, সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্যান্য এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার তিন হাজার টাকা প্রদান করতে হবে।

বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা হবে করযোগ্য মোট আয়ের (কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা হ্রাসকৃত করহারের আয় ছাড়া) ২৫ শতাংশ; প্রকৃত বিনিয়োগ; অথবা এক কোটি টাকা; এই তিনটির মধ্যে যেটি কম। রেয়াতের পরিমাণ নির্ধারিত হবে মোট আয় ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ হারে এবং ১৫ লাখ বেশি হলে ১০ শতাংশ হারে। করদাতার মোট পরিসম্পদ যদি তিন কোটির বেশি বা একের অধিক মোটরগাড়ি বা ৮ হাজার বর্গফুটের অধিক আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকে, তাঁকে ১০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ প্রদান করতে হবে।

আয়করের হার প্রথম তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর শূন্য, পরবর্তী এক লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী চার লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ২০ শতাংশ, অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ। যদি কোনো কারণে আপনার আয়কর ফাইলে পূর্বে নগদ অর্থ, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদি দেখানো না থাকে, নির্দিষ্ট কর দিয়ে যেমন নগদ টাকার ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ হারে কর এবং পরিশোধযোগ্য করের ওপর ৫ শতাংশ হারে অর্থাৎ মোট ২৬.২৫ শতাংশ হবে এবং জমি, ফ্ল্যাট বা বিল্ডিং হলে পরিমাপের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট হারে ট্যাক্স দিলে আপনাকে কোনো প্রশ্ন করা হবে না।

আয়কর বিষয়ে কয়েকটি টিপস

১. গত বছরের রিটার্নের ফটোকপি সঙ্গে রাখুন।

২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের একটি তালিকা তৈরি করুন।

৩. কাগজগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করুন নির্দিষ্ট সময়ের কি না। যেমন ২০২১-২২ করবছরের জন্য জুলাই ২০২০ থেকে জুন ২০২১ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হতে হবে।

৪. রিটার্নের একটি ফটোকপি করুন এবং গত বছরের রিটার্ন দিয়ে খসড়া রিটার্ন তৈরি করুন।

৫. প্রতিটি কাগজের দুটি করে কপি করুন।

৬. স্বাক্ষর করার আগে কমপক্ষে দুবার চেক করুন।

৭. যাঁরা নিজে রিটার্ন পূরণ না করে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা সুপ্রশিক্ষিত এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি ছাড়া কোনোমতেই খালি বা সাদা রিটার্নে স্বাক্ষর করবেন না।

৮. স্বাক্ষর করার আগে গত বছরের সম্পদগুলো যথাযথ পরীক্ষা করুন এবং এই বছরের নতুন কোনো সম্পদ থাকলে তা ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।

৯. মনে রাখবেন, আয়নার সামনে দাঁড়ালে আপনার চেহারা যেমন দেখা যাবে, রিটার্নে আপনার সম্পদের আয় এবং ব্যয়ের সম্পূর্ণ চিত্র ফুটে উঠবে।

১০. স্বাক্ষর করার পর একটি সেট আপনার ট্যাক্স ফাইলে সংরক্ষণ করুন।

১১. রিটার্ন জমা হওয়ার পর রিটার্ন জমা দেওয়ার স্লিপ সংগ্রহ করুন।

লেখক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, আয়কর আইনজীবী, নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ

আপনার টাকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন