default-image

সাধারণত সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই মানুষ ব্যাংক কিংবা বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) প্রতি মাসে কিছু টাকা সঞ্চয় করে। আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে বা কোনো বিপদে পড়লে তা থেকে রক্ষা পেতে ওই সঞ্চয়ের টাকাই প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে। মানুষের মধ্যে এখন সঞ্চয়ের এই প্রবণতা কেমন, তা জানতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে একটি জরিপ করেছে। এতে দেখা গেছে, দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় গড়ে ৩৩ শতাংশ খানা প্রতি মাসে সঞ্চয় করে। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি খানার মধ্যে ৩৩টির বাসিন্দারা সঞ্চয় করেন।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী ১২ সিটি করপোরেশনে প্রতিটি খানার গড় বার্ষিক সঞ্চয়ের পরিমাণ ৪৭ হাজার ৫৪২ টাকা। সেই হিসাবে খানাপ্রতি মাসিক সঞ্চয় হচ্ছে ৩ হাজার ৯৬১ টাকা। জরিপটি করা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, রাজশাহী সিটি করপোরেশন, সিলেট সিটি করপোরেশন, খুলনা সিটি করপোরেশন, বরিশাল সিটি করপোরেশন, রংপুর সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন।

তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তুলনায় অন্য ১০টি সিটি করপোরেশনে খানাপ্রতি সঞ্চয়ের হার প্রায় দ্বিগুণ। ঢাকা ও চট্টগ্রাম এই দুটি সিটি করপোরেশন এলাকায় সঞ্চয়ের জন্য মানুষের পছন্দের শীর্ষে আছে ব্যাংক। অন্যদিকে বাকি ১০ সিটি করপোরেশনের মানুষেরা এনজিওর মাধ্যমে সঞ্চয় করতেই বেশি পছন্দ করেন।

বিজ্ঞাপন

বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় সঞ্চয় করে ২৮ শতাংশ খানা। অন্য ১০টি সিটি করপোরেশনে এই হার ৫২ শতাংশ। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ খানার বাসিন্দারা সঞ্চয় করেন ব্যাংকে। এনজিওতে সঞ্চয় করেন ২৭ শতাংশ খানার মানুষ। এ ছাড়া সমিতিতে ৮ শতাংশ ও বিমা কোম্পানিতে সাড়ে ৫ শতাংশ খানার বাসিন্দারা টাকা রাখেন। অন্য ১০টি সিটি করপোরেশনের চিত্র ঠিক উল্টো। সেসব জায়গায় সর্বোচ্চ ৪৬ শতাংশ খানার বাসিন্দারা টাকা রাখেন এনজিওতে। আর ব্যাংকে সঞ্চয় করেন ২৯ শতাংশ খানার বাসিন্দা।

সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেশি। বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের পেছনে খরচের পর মানুষের সামনে আর সঞ্চয়ের তেমন সুযোগ থাকে না।
আহসান এইচ মনসুর নির্বাহী পরিচালক, পিআরআই

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সার্বিকভাবে সিটি করপোরেশন এলাকায় যদি ৩৩ শতাংশ খানা সঞ্চয় করে থাকে, তাহলে এটা খুবই কম। এই হারটা আরও বেশি হওয়া উচিত। এতে বোঝা যাচ্ছে, ধনীরা ছাড়া খুব বেশি মানুষ সঞ্চয় করতে পারছে না। সঞ্চয় করতে না পারার মূল কারণ হচ্ছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেশি। বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের পেছনে খরচের পর মানুষের সামনে আর সঞ্চয়ের তেমন সুযোগ থাকে না।

২০১৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জরিপটি পরিচালনা করে বিবিএস। এতে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ৭৫টি খানা এবং অন্য ১০ সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ৭৫টি খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এটির নাম দেওয়া হয় ‘নগর আর্থসামাজিক অবস্থা নিরূপণ জরিপ’।

* অন্য ১০ সিটি করপোরেশন এলাকায় সঞ্চয়ের হার ঢাকা ও চট্টগ্রামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। * ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ৪২% ও অন্য দশটিতে ৪৭% খানায় স্মার্টফোন আছে।

জানতে চাইলে জরিপের ফোকাল পয়েন্ট আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় অন্য ১০ সিটি করপোরেশনের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। যে কারণে দেশের সবচেয়ে বড় দুই শহরে সঞ্চয়ের হার কম, অন্যান্য সিটি করপোরেশনে তা বেশি।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় অন্য ১০ সিটি করপোরেশনের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। যে কারণে দেশের সবচেয়ে বড় দুই শহরে সঞ্চয়ের হার কম।
আলমগীর হোসেন ফোকাল পয়েন্ট, বিবিএস জরিপ

বিবিএসের জরিপ বলছে, সিটি করপোরেশনগুলোতে মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা যেমন রয়েছে তেমনি বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নেওয়ার অভ্যাসও আছে। ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের প্রধান ভরসা এনজিও। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে অন্য সিটি করপোরেশনগুলোতে এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার চিত্র বেশি দেখা গেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় যেখানে ৫৩ শতাংশ খানা এনজিও থেকে ঋণ নেয় সেখানে অন্যান্য সিটিতে এই হার ৭১ শতাংশ। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটিতে বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন থেকে ঋণ নেওয়ার হার ২০ শতাংশ, যা অন্যান্য সিটিতে ৮ শতাংশ। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটির ১২ শতাংশ খানা সমিতি থেকে ঋণ নেয়, অন্য সিটি করপোরেশনগুলোতে ঋণ নেয় ৭ শতাংশ খানা।

জরিপে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার ৪২ শতাংশ খানা জানিয়েছে, তাদের হাতে স্মার্টফোন আছে। অন্য ১০ সিটিতে অবশ্য ৪৭ শতাংশ খানা থেকে নিজেদের হাতে স্মার্টফোন থাকার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ খানা বলেছে, তাদের মোটরসাইকেল আছে। অন্য সিটিতে এই হার ১০ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন