আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক পতনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে পাকিস্তানকে
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর সারা বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন আফগানিস্তান। কারণ, দেশটিতে শান্তি আসবে কি না, তা এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠনের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত। আর এই সরকার গঠনের কারণে ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর সম্পর্ক কেমন হবে, সে বিষয়ে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ।
বর্তমানে আফগানিস্তানের মূল সমস্যা অর্থনৈতিক। আর্থিক পতনের একদম শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দেশটি। আর এটির প্রভাব দেশটির গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশের ওপর যে পড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দা যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে লাখ লাখ শরণার্থী পাকিস্তানের দিকে যাবে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে।
এমন নয় যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ত্যাগ করার আগে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ইতিবাচক ছিল। আফগানিস্তান বরাবরই চাহিদাচালিত, সীমাবদ্ধ সরবরাহ ও অত্যন্ত উন্মুক্ত অর্থনীতির একটি ক্ল্যাসিক দেশের প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে। বিশাল আর্থিক ব্যবধান ও দুর্বল সরকারি রাজস্ব যেখানে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাজেটের তিন-চতুর্থাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪২ শতাংশই আসে বৈদেশিক সাহায্য থেকে।
কোন পথে চলেছে আফগান অর্থনীতি
কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে বিদেশি দেশগুলোর সহায়তাও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এটার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে না পারায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে দেশটির। যদিও তালেবানদের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। তবে রাতারাতি আফগানিস্তানে বড় ধরনের বিনিয়োগে চীন যাবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সম্প্রতি পাকিস্তানে চীনা অবকাঠামোতে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে গেছে। সর্বশেষ এই আগস্ট মাসেও একটি হামলা হয়েছে। আফগানিস্তানের আমজনতা দেশে কোনো বিদেশি শক্তির উপস্থিতি মেনে নিতে পারে না, এটা ঐতিহাসিক সত্য। ফলে আফগানিস্তানের মাটিতে চীনারা বেশি দিন অবস্থান করার মতো বড় বিনিয়োগে অন্তত এখনই যাবে না বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই-তৃতীয়াংশ আফগান প্রতিদিন মাত্র ১ দশমিক ৯০ ডলারে (এই হার আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে) জীবিকা নির্বাহ করেন। আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে চলেছে। কাবুলে রাজনৈতিক পালাবদলের পরপরই ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ উঠিয়ে নেওয়ার হিড়িক পড়ে। এটিএমগুলোতে দ্রুত নগদ ফুরিয়ে যায়। অর্থনীতিবিদেরা এই ঘটনাকে ‘তারল্য ফাঁদ’ বলে অভিহিত করেন; অর্থাৎ অনিশ্চয়তা যখন মানুষকে অর্থ সঞ্চয় করে রাখতে বাধ্য করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আফগানিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিমায়িত করে রেখেছে। অর্থাৎ দেশটির এখন খাদ্য, প্রয়োজনীয় পণ্য বা জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আমদানি করার সক্ষমতা নেই। এর মধ্যে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি আফগানদের নাগালের বাইরে করে দিচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু। এর মধ্যে বিদেশি সাহায্য যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আফগান অর্থনীতি আগামী দুই বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ সংকুচিত হবে, ফলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারাবেন। অর্থনীতি এই ভয়াবহ অবস্থার দিকে মোড় নিলে আফগানদের দারিদ্র্য ও দুর্দশার আরও চরমে উঠবে। এর মানে, পাকিস্তানের দিকে একটি বিশাল শরণার্থী বাহিনী নির্বাসিত হতে চলেছে। কাবুল তালেবানের দখলের যাওয়ার পরপরই ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে।
পাকিস্তানের ভূমিকা কী হতে পারে
প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানের কতটা সক্ষমতা রয়েছে এই শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার। দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তান এই শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার মতো অবস্থানে নেই। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পাকিস্তান সরকারের বেনজির ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রামে মাত্র ১৬৮ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি দিতে পেরেছেন পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকেরা। সম্পদের অভাবে শরণার্থীদের এই বাড়তি ঢেউ পাকিস্তানে বেশ কিছু গুরুতর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। অনেক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানে প্রায় আড়াই কোটি শিশু স্কুলশিক্ষার বাইরে রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে স্কুলবয়সী অতিরিক্ত শিশুদের মোকাবিলা করবে?
এ ছাড়া অধিকাংশ আফগান শরণার্থী অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কম বেতনের চাকরি গ্রহণ করবেন, ফলে তাঁরা দরিদ্র পাকিস্তানি নাগরিকদের চাকরি ছিনিয়ে নেবেন। অবশেষে পাবলিক সার্ভিস, শিক্ষা ও চাকরির ওপর আরও চাপ সব সময় জাতিগত কলহ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে করাচির মতো বড় শহরে।
এই পরিস্থিতি এড়ানোর একটি উপায় হলো, আফগান শরণার্থীরা শুধু ডুরান্ড লাইনের (আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ২ হাজার ৪৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত) পশ্চিমে বসতি স্থাপন করবে—এমনটা নিশ্চিত করা। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অবশ্যই এই শরণার্থী বসতিতে শিক্ষক, চিকিৎসক ও নার্স পাঠিয়ে আফগানদের সাহায্য করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। তবে সমস্যা হচ্ছে, সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যাবে যদি আফগান অর্থনীতি স্থিতিশীল না হয়। আফগান নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই রাজনৈতিক সরকারের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আলাদা করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দিতে হবে। পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকেরা যা করতে পারেন তা হলো, আফগান আমদানিকারকেরা যেন স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় মেটাতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা; অন্তত প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য। এ ছাড়া স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান আফগানদের জন্য প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় সোয়াপ লাইন স্থাপন করতে পারে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস আমদানি করতে সাহায্য করবে। সর্বোপরি যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশের জনগণকে সহায়তা করার জন্য আফগান ও পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে আফগান অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার কাজও করতে হবে।
সূত্র: স্ক্রল ডট ইন ও সিএনবিসি