default-image

‘আমি কখনো অবসর নিতে চাই না। আমি কাজ করব যত দিন মানুষ আমাকে চায়। যখন আর মানুষ চাইবে না, তখন আমি নতুন কোনো কাজ করব’—এই একটা বাক্যই মেই মাস্ককে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট। মেই মাস্ক জানেন কীভাবে নিজের গুরুত্ব ধরে রাখতে হয় এবং আরও জানেন গুরুত্ব কমে গেলেও তিনি অপ্রয়োজনীয় হবেন না।
তো কে এই মেই মাস্ক? কেনই-বা তাঁকে নিয়ে আলোচনা? মেই মাস্কের একটা সহজ পরিচয় হচ্ছে তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী কিম্বাল মাস্ক ও দক্ষিণ আফ্রিকার চলচ্চিত্র নির্মাতা টোসকা মাস্কের মা। তবে এটা তাঁর পরিচয় নয় মোটেই। বরং এভাবে পরিচয় দিলে ঠিক হয় যে এই তিন সফল ব্যক্তিত্ব মেই মাস্কের সন্তান।

মেই মাস্ক একজন সুপারমডেল। যেনতেন সুপারমডেল নন। তিনি একজন ৭২ বছর বয়সী সুপারমডেল, যার দাপুটে উপস্থিতি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে, ফ্যাশন শোর রানওয়েতে। তাঁর সাদা চুল, কুঁচকে আসা ত্বক—সবকিছু মিলিয়ে মেই মাস্ক আত্মবিশ্বাসে অনন্য। এই আত্মবিশ্বাসের কারণেই তিনি শুধু একজন মডেল নন, ফ্যাশন ও বিউটি কোম্পানিগুলো তাঁকে নিয়োগ দেয় বক্তা হিসেবে। কারণ, মেই একজন ডায়েট বিশেষজ্ঞ।

বিজ্ঞাপন
default-image

মডেলদের ক্যারিয়ার যেখানে ২৫ বছরেই শেষ হয়ে যায়, মেই মাস্কের এই সাফল্য কীভাবে? একটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনের এই প্রশ্নের জবাবে মেই মাস্ক বলেছিলেন, ‘আমি তো ভেবেছিলাম ১৮-তেই শেষ হয়ে যায়। আমাদের সময় তা-ই হতো। কিন্তু ভাগ্য ভালো আমি মডেল হওয়ার পাশাপাশি পুষ্টিবিদও ছিলাম। তাই বেশি কষ্ট হয়নি।’

মুখে স্বীকার না করলেও মেই মাস্ক জীবনে খেটেছেন অনেক। তাঁর জীবনও ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। মেইর মা-বাবা কানাডীয়। কিন্তু তিনি বড় হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকাতে একটা প্লেনে। ঠিক শুনেছেন, প্লেনেই। সব মা-বাবা যখন ছেলেমেয়েদের বাড়িতে রেখে গাড়িতে করে ঘোরান, মেই মাস্কের বাবা প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. জসুয়া নরমান হাল্ডেম্যান ছেলেমেয়েদের কালাহারি মরুভূমিতে বড় করেছেন। তাঁর একটা ছোট প্রপেলার প্লেন ছিল। সেটাই ছিল বাড়িঘর।

১০ বছর পর্যন্ত হাল্ডেম্যান প্লেনে করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তো বেড়ানোর ফাঁকফোকরে যে লেখাপড়া করেছিলেন, সে-ও কম নয়। ডায়েট, পুষ্টি—এই দুই বিষয়েই তিনি উচ্চতর ডিগ্রি নেন তিনি। মডেলিংও শুরু করেছিলেন সেই বয়সে। ১৯৬৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত পর্বে ছিলেন। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার এক তরুণ প্রযুক্তিবিদ ইরোল মাস্ককে বিয়ে করেন, কিন্তু মাত্র ৯ বছরেই বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাঁদের। তিন সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে শুরু হয় মেইর নতুন জীবন।

default-image

‘আমাদের সময়ে ইন্টারনেট ছিল না। তাই আমি জানতামও না মেয়েরাও প্রযুক্তিবিদ হতে পারে। তবে আমার পড়তে ভালো লাগত। বিজ্ঞানের সব বিষয় পড়তাম, শেষ পর্যন্ত ডায়েট ও পুষ্টিবিজ্ঞানে থিতু হলাম,’—নিজের পেশাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেন মেই। ইরোলের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ফিরে যান কানাডায়। শুরুতে দুই ছেলে ইলন ও কিম্বল ছিল বাবার কাছে। টোসকা একা মায়ের কাছে বড় হয়, কিন্তু অচিরেই তিন বাচ্চাই মায়ের কাছে চলে আসে আর তিন বাচ্চার দায়িত্ব নিয়েই মেই এগিয়ে যান।

ডায়েটিশিয়ানের কাজটা সে সময় কঠিন ছিল। চিকিৎসকদের কাছে ঘুরতেন কাজের আশায়। ১০০ জন রোগীর মধ্যে হয়তো ৪ জন রোগীর ডায়েটিশিয়ান বা পুষ্টিবিদের সহায়তা লাগত। তাদের কাছে গেলে কাজ পাওয়াই যাবে, এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। কাজেই মেই তিন বাচ্চার খরচ চালানোর মতো টাকা জোগাড় করতে মডেলিংও করতেন। এত কাজের পরও মাস্কদের কোনোক্রমে একটা ভাড়া বাড়ি ছাড়া কিছুই ছিল না। এমনকি বাড়িতে আসবাবও না। তবে এই অভাবটা মেই নিজেও স্বীকার করতেন না, তাঁর ছেলেমেয়েও না। তাঁদের জন্য থাকার ঘর ছিল, খাবার ছিল, আর তাঁরা খুশি ছিলেন—এতটুকুই যথেষ্ট ছিল মাস্কদের জন্য।

মেই মাস্ক এখন যখন তাঁর স্মৃতিচারণা করেন, সেখানে ছেলেমেয়েদের কথা আসে। বিশেষ করে তাঁর মহা বুদ্ধিমান বড় ছেলে ইলন মাস্কের কথা। ইলন ছোটবেলা থেকেই অনেক পরিকল্পনা একসঙ্গে করতেন।

এক টিভি সাক্ষাৎকারে হাসতে হাসতে মেই বলেন, ‘ইলন আমার কথা শুনলই না। একসঙ্গে তার ইলেকট্রিক গাড়ি, রকেট—সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বসল! এমনকি রকেটে আগুন লেগে যাওয়ার পর ভাবলাম, যাক, এখন অন্তত ছেলে বুঝেছে একসঙ্গে এত কাজ করতে নেই। কিসের কী? ইলন বলে কি, ‘মা, এবার আমরা বুঝেছি ভুল কোথায় হয়, সামনে এটা ঠিক করতে হবে।’
বিজ্ঞাপন

মেই তাঁকে বলেছিলেন, ‘করবি যখন, যেকোনো একটা কর।’ এক টিভি সাক্ষাৎকারে হাসতে হাসতে মেই বলেন, ‘ইলন আমার কথা শুনলই না। একসঙ্গে তার ইলেকট্রিক গাড়ি, রকেট—সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বসল! এমনকি রকেটে আগুন লেগে যাওয়ার পর ভাবলাম, যাক, এখন অন্তত ছেলে বুঝেছে একসঙ্গে এত কাজ করতে নেই। কিসের কী? ইলন বলে কি, মা, এবার আমরা বুঝেছি ভুল কোথায় হয়, সামনে এটা ঠিক করতে হবে।’

তিন বাচ্চা নিয়ে মডেলিং করার বিষয়ে মেই মাস্কের বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছিল না। তিনি বরং তিন বাচ্চাকে নিয়েই অনুষ্ঠানে চলে আসতেন। সন্তানরা তাঁকে কাজেও সাহায্য করত। এভাবে তিনি সন্তানদের তৈরি করতেন নিজেদের জীবনের জন্য।

তিন বাচ্চা নিয়ে মডেলিং করার বিষয়ে মেই মাস্কের বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছিল না। তিনি বরং তিন বাচ্চাকে নিয়েই অনুষ্ঠানে চলে আসতেন। সন্তানরা তাঁকে কাজেও সাহায্য করত। এভাবে তিনি সন্তানদের তৈরি করতেন নিজেদের জীবনের জন্য। মেই বলেন, ‘আমি নিজেও বড় হয়েছি এভাবে। আমার বাবাও আমাদের নিয়েই তাঁর প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা করতেন।’

ছোট থেকে এই জীবনমুখী শিক্ষার জন্যই কি না, মেই মাস্কের ছেলেমেয়েরা যা করেছেন, তাতেই সফল। ইলনের কথা তো সবাই জানেই। তাঁর ছোট ভাই কিম্বাল রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল উদ্যোক্তা। বর্তমানে বড় ভাই ইলনের পথ ধরে তিনিও মঙ্গলের দিকে আছেন। সেখানে কিম্বাল জৈবিক সার দিয়ে সবজি চাষের গবেষণার চেষ্টা করছেন। মেই মাস্কের একমাত্র কন্যা টোসকা চলচ্চিত্র নির্মাতা। মেই মাস্কের ব্যাখ্যায় টোসকা তাঁর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগের নারীদের কথা বলেন, যাঁরা জীবনে অর্থবহ কিছু করেন, যাঁরা জীবনে গুরুত্ব পান, জীবনে জিতে যান।

জীবনে অনেক সুন্দর দিক দেখার পাশাপাশি কদর্য অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন মেই। স্বামী ইরোলের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সহিংসতার অভিজ্ঞতাও আছে। এত কিছুর পরও মেই জীবনে জিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল আছেন। আর ১০টা নাতিনাতনিসহও ৭২ বছর বয়সী মেই যখন তাঁর খ্যাতির তুঙ্গে টিকে আছেন, সত্যিই কার সাধ্য মেই মাস্ককে হারায়?

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন