৪০ অর্থনীতিবিদের মতামত

উত্তরণের পথে যেভাবে এগোতে হবে

বিজ্ঞাপন
default-image

‘মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে, দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা—তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা’—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতার মতোই বলতে হয় মহা দুঃসময়, তবে উত্তরণের পথ খুঁজে নিতেই হবে। চলার পথ বন্ধ করা যাবে না। প্রায় সাত মাস ধরে করোনার তীব্রতায় সব লন্ডভন্ড হলেও পুনরুদ্ধারে ভাবতে হবে। অর্থনীতিবিদেরা এ জন্য খুঁজছেন নানা পথ। সরকারগুলোও ভাবছে। বড়–ছোট সব দেশই এখন করোনা–পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে মনোযোগী হচ্ছে।

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ৪০ জন অর্থনীতিবিদের কাছে করোনা–পরবর্তী পুনরুদ্ধারে তাঁদের মতামত নিয়ে ‘চিফ ইকোনমিস্ট আউটলুক’ প্রকাশ করেছে। এই অর্থনীতিবিদেরা বর্তমানে দেশগুলোর জন্য তিনটি উদীয়মান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। তাঁরা বলছেন, করোনা সংকট বৈষম্যকে আরও খারাপভাবে তুলে ধরছে, তবে আশার কথা হলো, এটির সমাধানের জন্য অন্য সুযোগও তৈরি হচ্ছে। যে তিনটি উদীয়মান চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো ১. বৈষম্য হ্রাস ও সামাজিক গতিশীলতা বাড়াতে অর্থনৈতিক নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা, ২. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস চিহ্নিত করা এবং ৩. অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে নতুন লক্ষ্যের ওপর মনোযোগ দেওয়া।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদিয়া জাহিদি বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। যেহেতু আমরা এই সংকট থেকে উঠে আসছি, অর্থনৈতিক বিকাশ ও গুণমানের দিকটি অবশ্যই তার গতির চেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’

এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে আসল সংকট বুঝতে হবে। সেই সঙ্গে ঠিক করতে হবে পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্য পথগুলো কী হতে পারে। অর্থনীতিবিদেরা এসব কিছু ভেবে বর্তমান সময়ের জন্য পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করেছেন।

১. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয়ে আশাবাদী শেয়ারবাজার, তবে...

বেশির ভাগ প্রধান অর্থনীতিবিদ মনে করেন, একটি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক তথ্য আর শেয়ারবাজারের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন হয়। তাই বর্তমান আর্থিক বাজারের তুলনায় বেকারত্বের হারের পরিসংখ্যান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে আরও ভালো দিকনির্দেশনা দেয়। বর্তমান সময়ে শেয়ারবাজারগুলো ভোক্তা ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক লক্ষণ দেখে উৎসাহিত হলেও দুটোই এখনো করোনা–পূর্ববর্তী অবস্থার কাছে পৌঁছায়নি। এটাই বড় সংকট। সেই সঙ্গে ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আবার লকডাউনের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। বিভিন্ন কোম্পানি তাদের শ্রমশক্তি সংকুচিত করে এবং বিনিয়োগ কমিয়ে নিজেদের মুনাফা রক্ষা করছে। এতে করে আগামী বছরে বেকারত্ব বাড়তে পারে, উদ্ভাবন কমে যেতে পারে, সর্বোপরি কমে যাবে ভোক্তার ব্যয়। এটি একটি চক্রের মতো। বর্তমান পরিস্থিতি শ্রমবাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা করছেন, সাময়িকভাবে ঘুরে দাঁড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেকারত্ব পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

২. বৈষম্য কমানো যাবে যেভাবে

কয়েক বছর ধরেই বিশ্বে বৈষম্য বাড়ছে। প্রযুক্তির পরিবর্তন ও বৈশ্বিক একীকরণের সুফল বিশ্বের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছাতে পারছে না। কোভিড-১৯ এই বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। কারণ, পৃথিবীর এই রোগ সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছেন যাঁরা, তাঁদের ওপরই অসম প্রভাব ফেলছে। করোনার কারণে যে আর্থিক বোঝা তৈরি হচ্ছে, তা ভাগ করে নেওয়া জটিল হবে। আবার এসব বিশৃঙ্খলা মোকাবিলা করার একটা সুযোগও তৈরি করেছে এই করোনা। বিষয়টি এমন। বুঝিয়ে বলা যাক। বৈষম্য কিন্তু এই সংক্রমণের আগে থেকেই ছিল, করোনার কারণে সংকট কেবল তীব্র হয়েছে। আবার করোনার কারণেই সরকারগুলো, নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপের বিষয়ে জোর দিচ্ছেন। তাঁরা মনে করছেন, বৈষম্যকে আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়া ঠেকাতে সুদূরপ্রসারী পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনার এখন একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারগুলো অন্য লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি অসমতা পর্যবেক্ষণ, সামনের আঘাতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার উন্নতি এবং নতুন অর্থনীতিতে আর্থসামাজিক গতিশীলতা বিকাশে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

৩. কর নিয়ে পুনর্বিবেচনায় সরকারগুলো

করোনার কারণে যে বৈষম্য বাড়ছে, তাতে করের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলে মনে করেন প্রধান অর্থনীতিবিদেরা। কর কাঠামোর পুনর্গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নানাভাবে হতে পারে। যেমন কর ফাঁকি দেওয়া রোধে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নিরপেক্ষ ডিজিটাল কর কার্যক্রমের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সম্পদ কর এবং উচ্চ প্রান্তিক আয়কর পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। যেহেতু পুনরুদ্ধারের জন্য ঋণ বাড়লেও সরকারগুলো প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করেছে, তাই সরকারগুলোর নাগরিকদের আস্থা ফিরে পাওয়ার এক বড় সুযোগ রয়েছে, যে সুযোগ বহু বছর ধরেই তারা পায়নি।

৪. সরবরাহ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে

প্রযুক্তির মান নিয়ে বাণিজ্যবিরোধ এবং উত্তেজনার কারণে এমনিতেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বিদ্যমান, করোনা যেন তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লকডাউনের কারণে যে বাণিজ্য কমে গেছে, তা হয়তো সাময়িক। তবে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো ক্ষতির মুখে পড়বে, যদি কোম্পানিগুলো তাদের সরবরাহব্যবস্থা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এসব দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় অথবা সমতুল্য দেশগুলোকে নতুন উৎস বানায়।

এমনিতে পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে গিয়ে বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো উচ্চ-নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছে। এখন সংক্রমণ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অনিশ্চয়তার ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলার আরও বিঘ্ন ঘটতে পারে। তবে উদীয়মান বাজারগুলো যদি প্রতিযোগিতামূলক দামের পরিষেবাগুলো সরবরাহ করতে পারে এবং একটি নতুন অর্থনৈতিক বিকাশের মডেল তৈরি করতে পারে, তাহলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এ ক্ষেত্রে তাদের মানবসম্পদে উচ্চ বিনিয়োগ করতে হবে।

৫. সঠিক পদক্ষেপ নিলে নতুন বাজারের উত্থান হতে পারে

সংকট উদ্ভাবনের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। উদ্ভাবন হলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতির আরেকটি মূল চালক। মহামারি, বৈষম্য এবং জলবায়ু–সংকট মোকাবিলার প্রভাব কাটাতে উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ। তবে করোনার কারণে অর্থনৈতিক সংকোচনের ফলে গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। সরকারগুলো শক্তিশালী উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগের কৌশল নিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতিটিকে সঠিক পথে আনতে পারে, তবে এর জন্য এ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন। আর যা কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো একত্র হয়ে কাজ করবে এবং সরকারগুলো বিদ্যমান খাতগুলো পুনর্নির্মাণ এবং নতুন বাজার তৈরিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত হবে। অর্থনীতিবিদদের মতামতে বলা হয়েছে, সবুজ শক্তি অর্থনীতি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যত্ন ও নতুন পরিবর্তিত সমাজে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখন সমাজগুলোর জন্য আরও বেশি সবুজ বৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগের এক অনন্য জানালা খুলে গেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন