একদিকে ৭.৫ কোটি নতুন দরিদ্র, আরেক দিকে শীর্ষ ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধি

করোনা মহামারিতে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারত। গত অর্থবছরে দেশটির জিডিপি সংকোচন হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই বিপুলসংখ্যক মানুষ আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। আবার আক্রান্ত জনসংখ্যার দিক থেকেই দেশটির অবস্থান এখন দ্বিতীয়, স্থানটি যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। অথচ এর মধ্যেও দেশটিতে অতিধনীদের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির সম্পদের পরিমাণ এখন ৮০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। ঠিক এক বছর আগের তুলনায় যা এখন ১৫ বিলিয়ন ডলার বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি পোয়াবারো হয়েছে আদানি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম আদানির। তাঁর সম্পদ ১৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ বিলিয়ন ডলারে।

বাস্তবতা হলো, এঁরা দুজন যথাক্রমে এশিয়ার প্রথম ও চতুর্থ শীর্ষ ধনী। তাঁদের সম্মিলিত সম্পদ কোনো কোনো দেশের জিডিপির চেয়েও বেশি। যে দেশে বসে তাঁরা এত সম্পদেও মালিক হয়েছেন, সেই দেশেই আবার ২০২০ সালে মহামারির জেরে সবচেয়ে বেশি মানুষ দরিদ্র হয়েছেন, বৈশ্বিক মোট নতুন দরিদ্রের অর্ধেক।

মহামারির এই সময়ের সিংহভাগজুড়েই মুকেশ আম্বানি ছিলেন এশিয়ার শীর্ষ ধনী। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বের ১২তম শীর্ষ ধনী। এমনকি চীনা টাইকুনেরাও তাঁর সঙ্গে পেরে ওঠেন না। ২০২০ সালে তাঁর আরও পোয়াবারো হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির রথী-মহারথী, যেমন গুগল ও ফেসবুক গত বছর তাঁর কোম্পানিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এরা সবাই ধরে নিয়েছে, এত বড় ইন্টারনেটের বাজার মুকেশ আম্বানির হাতেই থাকবে।

শীর্ষ ধনীর তালিকায় আম্বানি এখন আর একমাত্র ভারতীয় নন। এই কদিন আগে পর্যন্ত এশিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ছিলেন আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। বন্দর, মাহাকাশ, কয়লা কোথায় নেই আদানি গ্রুপের বিনিয়োগ। রিলায়েন্সের মতো গত বছর আদানি গ্রুপের শেয়ারের দাম অনেকটাই বেড়েছে। ২০২০ সালের জুলাই মাসের পর মুম্বাইয়ের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে আদানি এন্টারপ্রাইজের শেয়ারের দাম ৮০০ শতাংশ বেড়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছেন বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বলা দরকার, এই দুজন শীর্ষ ধনীর আদি নিবাস ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মস্থান গুজরাটে। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পেছনে এই দুজনের সমর্থনের কথা সুবিদিত।

এবার বাকি ৯৯ শতাংশের কথায় আসা যাক। মহামারির বছরে এত ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও ২০২০ সালের শেষে ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর সম্পদ জাতির মোট সম্পদের সাপেক্ষে দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০০০ সালের তুলনায় যা ৭ শতাংশ বেড়েছে।

ক্রেডিট সুসির গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্টে বলা হয়েছে, অসমতার সূচক জিনি সহগও এ সময় অনেকটাই বেড়েছে। ২০০০ সালে জিনি সহগ ছিল যেখানে ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২০ সাল শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৮২ দশমিক ৩ শতাংশ।

অন্যদিকে মহামারিতে ২০২০ সালে নতুন করে ৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। এর ফলে গত বছর বিশ্বে যত মানুষ দরিদ্র হয়েছেন, তার ৬০ ভাগই হয়েছে ভারতে। তবে এই হিসাবে দ্বিতীয় ঢেউয়ের পরিসংখ্যান উঠে আসেনি। সেই তুলনায় এ সময় চীনাদের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। তারা চরম দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে গত বছর।

মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় ভারত অনেক বড় প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো তা মূলত ঋণের মধ্যেই সীমিত। অর্থনীতিবিদেরা মানুষের হাতে যে নগদ অর্থ তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, তাতে খুব একটা কর্ণপাত করেনি দেশটির সরকার। ফলে দরিদ্রদের দুরবস্থার তেমন অবসান হয়নি।

এরপর আবার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা আছে। তাতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার শঙ্কা আছে।