default-image

১২ অক্টোবর থেকে চমৎকার একটি ভিডিও ঘুরছে নেট দুনিয়ায়। গভীর রাতে এক ব্যক্তি ও এক নারী একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত বেল দিচ্ছেন, ব্যস্ত ভঙ্গিতে একবার দরজার নবটাও ঘুরিয়ে দেখলেন ব্যক্তিটি। ‘পল’ বলে ডাকতে থাকেন একজনকে। দরজার পাশে থাকা সিকিউরিটি ক্যামেরায় সময় দেখাচ্ছে রাত ২টা ১৫ মিনিট। একসময় একজন দরজার কাছে আসেন। তাঁকে উদ্দেশ করে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘পল, তুমি নোবেল পেয়েছ। তারা তোমাকে ফোন দিতে চাচ্ছিল, কিন্তু পারেনি। মনে হয় তাদের কাছে তোমার নম্বর নেই।’ ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। একটু পরেই কণ্ঠটা বলে ওঠে, ‘আহ আমি পেয়েছি।’

ভিডিওর এই পল হলেন এ বছরের অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী পল আর মিলগ্রম। তাঁকে যিনি খবরটা দিলেন তিনিও এ বছরের অর্থনীতির নোবেল বিজয়ী রবার্ট বি উইলসন। তাঁদের দুজনকেই নোবেল পুরস্কার প্রদানের জন্য বেছে নিয়েছে সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

করোনার এ সময়ে বিশ্ব যখন গভীর এক মন্দায় ডুবে রয়েছে, এ অবস্থায় নিলামতত্ত্বের উন্নয়ন ও রীতি আবিষ্কারের জন্য নোবেল পেয়েছেন এই দুজন। এমন সময়ে এমন তত্ত্বের জন্য কেন? এ প্রশ্নের চমৎকার উত্তরটা মিলেছে সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের নোবেল পুরস্কার কমিটির কাছ থেকেই। নোবেল পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান পিটার ফ্রেডরিখসন এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ বছরের অর্থনীতিতে যাঁরা নোবেল পেয়েছেন, তাঁরা মৌলিক তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন ঠিকই, তবে পরবর্তীকালে সেই ফলাফল বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করেছেন তাঁরা। তাঁদের উদ্ভাবন সমাজের প্রভূত উপকারে আসবে।

রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস আরও জানায়, নিলামের তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা সর্বোচ্চ দরপ্রত্যাশীদের সুবিধা করে দিতে চাননি, বরং যাঁরা সমাজের ভালো করতে চান, তেমন প্রকৃতির নিলামকারীদের হয়ে কাজ করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় তাঁরা বিভিন্ন ধরনের আন্তসম্পর্কিত পণ্যের নিলামের নতুন রীতি উদ্ভাবন করেছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

দুই অর্থনীতিবিদ

প্রথমেই পরিচয় দিই রবার্ট বব উইলসনের। ১৯৩৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের জেনেভা শহরে জন্মগ্রহণ করেন উইলসন। ব্রিটানিকা ডট কমের তথ্য অনুযায়ী, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে ব্যাচেলরস ডিগ্রি নেন উইলসন।

১৯৬১ সালে সেখান থেকেই এমবিএ এবং এর দুই বছর পর ১৯৬৩ সালে ডক্টরস অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিগ্রি নেন উইলসন। এরপর তিনি যোগ দেন ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি অ্যাথল ম্যাকবিয়ান অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৯৬৪ সাল থেকেই সেখানে আছেন। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ইমেরিটাস অ্যাডামস অধ্যাপক। রবার্ট উইলসন অর্থনীতির গেম থিওরি এবং তার প্রায়োগিক জ্ঞানে বিশ্বনন্দিত একজন বিশেষজ্ঞ। তাঁর গবেষণার মধ্যে রয়েছে বাজার পরিকল্পনা, মূল্য নির্ধারণ, দর-কষাকষি, তথ্য অর্থনীতি, শিল্পসংগঠন, নিলাম পরিকল্পনা, জ্বালানি, প্রযুক্তিগত যোগাযোগ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি খাতে প্রতিযোগিতামূলক ডাকের পদ্ধতি নির্ধারণ। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্য থিওরি অব সিন্ডিকেটস কয়েক প্রজন্ম ধরে ইকোনমিকস, ফাইন্যান্স ও অ্যাকাউন্টিংয়ের শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে যাচ্ছে।

এবার পল মিলগ্রমের পরিচয় তুলে ধরি। মিলগ্রমের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রোয়েট এলাকায়, ১৯৪৮ সালে। ১৯৭০ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাথমেটিকসে ব্যাচেলরস ডিগ্রি নেন মিলগ্রম। সেখানেই ১৯৭৮ সালে এমএস করেন স্ট্যাটিসটিকস বিভাগ নিয়ে। পরে ১৯৭৯ সালে বিজনেসে পিএইচডি করেন তিনি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আগে তিনি নর্থ-ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি (১৯৭৯-৮৩) ও ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে (১৯৮২-৮৭) পড়িয়েছেন তিনি। স্ট্যানফোর্ডে তিনি অর্থনীতির অধ্যাপক এবং স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর থিওরিটিক্যাল ইকোনমিকসের পরিচালক (১৯৮৯-৯১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে ১৯৮৭ সালে এখানে মানবতা ও বিজ্ঞান বিভাগের ‘শিরলি অ্যান্ড লিওনার্ড এলি প্রফেসর’ পদে নিযুক্ত হন তিনি।

উইলসন ও মিলগ্রমের শিক্ষক

১২ অক্টোবর রবার্ট উইলসন ও মিলগ্রমকে এ পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা আসে। এরপর বেশ কিছু দিন পার হয়েছে। সব গণমাধ্যমেই মোটামুটি তাঁদের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পুরস্কার কমিটির বিশাল বক্তব্যের সারমর্ম হলো, এই দুই অর্থনীতিবিদের সবচেয়ে পরিচিত কাজ হলো, জটিল নিলামের জন্য নতুন রীতির প্রবর্তন করা। বিভিন্ন দেশের সরকার এখন যেভাবে টেলিকমগুলোকে তরঙ্গ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। মিলগ্রম ও উইলসন প্রবর্তিত রীতিতে বিভিন্ন অঞ্চলে একই সঙ্গে নিলামের সুযোগ সৃষ্টি হলো। যা–ই হোক আজ সেই সব তাত্ত্বিক নয় বরং কিংবদন্তি এক শিক্ষকের পরিচয় তুলে ধরতে চাই।

তার আগে ছোট্ট করে একটি তথ্য জানাই, যে নিলাম তত্ত্বের জন্য তাঁরা নোবেল পেয়েছেন তাঁর উদ্ভাবক হলেন, কানাডীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ভিকরে। নিলামের গতিশীলতা ব্যাখ্যা করার জন্য গেম থিওরি প্রথম ভিকরেই ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে অসম্পূর্ণ তথ্যের অধীনে প্রণোদনা তত্ত্বের জন্য নোবেল পান ভিকরে। ভিকরের এখন আরেকটি পরিচয় হলো তিনি নোবেল লরিয়েট রবার্ট বি উইলসন ও পল মিলগ্রমের শিক্ষক।

আরও মিল হচ্ছে এই দুজনের কারোরই প্রথম ভালোবাসা অর্থনীতি ছিল না। এবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উইলসন নিজেই বলেছেন অর্থনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচিতিটা নাকি হয়েছে ঘটনাক্রমে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও গ্র্যাজুয়েট লেভেলে অর্থনীতি কোর্স নিয়েছিলেন তিনি তবে কখনোই মনোযোগী ছিলেন না। অন্য দিকে মিলগ্রমেরও আনুষ্ঠানিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না অর্থনীতিতে।
default-image

কিংবদন্তি উপদেষ্টা রবার্ট উইলসন

ওপরের লেখা থেকে একটা প্রশ্ন আসতে পারে, এত রাতে উইলসন কীভাবে ছুটে গিয়েছিলেন মিলগ্রমের বাড়িতে। আসলে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছেন দুই অর্থনীতিবিদ। ১৯৭০ সালের দিকে উইলসন ছিলেন মিলগ্রমের পিএইচডির সুপারভাইজার। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ডে একসঙ্গে রয়েছেন মিলগ্রম ও উইলসন। এমনকি তাঁরা বাসও করেন কাছাকাছি। স্ট্যানফোর্ডে দুজনের বাসা রাস্তার এপার–ওপার।

আরও মিল হচ্ছে এই দুজনের কারোরই প্রথম ভালোবাসা অর্থনীতি ছিল না। এবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উইলসন নিজেই বলেছেন অর্থনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচিতিটা নাকি হয়েছে ঘটনাক্রমে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও গ্র্যাজুয়েট লেভেলে অর্থনীতি কোর্স নিয়েছিলেন তিনি তবে কখনোই মনোযোগী ছিলেন না। অন্য দিকে মিলগ্রমেরও আনুষ্ঠানিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না অর্থনীতিতে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পিএইচডি করতে আসেন তখন অর্থনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয়টা ঘটান শিক্ষক উইলসন।

বিজ্ঞাপন
default-image
নিজের ব্লগে রথ লেখেন, এটাকে কি সেরা নোবেল জুটি বলা যায় না? রবার্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য কিংবদন্তি উপদেষ্টা। নোবেল বিজয়ী পল হলো রবার্টের তৃতীয় ছাত্র। তাঁকে তো নোবেল রাজবংশের পিতৃপুরুষ বলাই যায়।

তবে উইলসনের মাত্র এক ছাত্র কিন্তু নোবেল পাননি। মিলগ্রমকে দিয়ে সরাসরি তিন ছাত্র অর্থনীতির নোবেল পেলেন। ২০১২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পান উইলসনের ছাত্র আলভিন রথ। ২০১৬ সালে পান আরেক ছাত্র বেঙ্গট হোমস্ট্রম। আর এবার ছাত্র পল মিলগ্রমের সঙ্গে নোবেল পেলেন শিক্ষক নিজেও। নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন উইলসনের এমন আরও কজন ছাত্রের নামও এখন আলোচনায় আসছে।

বিষয়টি ভাবুন গত ৫২ বছরে নোবেল কমিটি ৮৬ জন অর্থনীতিবিদকে নোবেল সম্মানে ভূষিত করেছে। তার মধ্যে তিনজনই উইলসনের ছাত্র। তাঁকে তো কিংবদন্তিই বলা চলে।

আলভিন রথ নিজে ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর এক ব্লগ পোস্টে তাঁর শিক্ষক বব উইলসন সম্পর্কে লিখেছিলেন, স্ট্যানফোর্ডে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আসা জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মাইকেল মাশলারের একটি ক্লাস করার পরই আমি সিদ্ধান্ত নিই গেম থিওরি হবে আমার গবেষণার বিষয়। রবার্ট উইলসন আমার সুপারভাইজার হতে রাজি হলেন। শুধু তা-ই নয়, পিএইচডির জন্য যোগ্য হতে যেসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, তার একটিতে আমি পাস করতে না পারলেও তিনি তা সামলে নেন। সেই বছরটা ছিল তাঁর শিক্ষাছুটির বছর। তবু তিনি প্রতি সপ্তাহে একদিন আমার জন্য ১ ঘণ্টা বরাদ্দ রেখেছিলেন। প্রতিটি সাক্ষাতের পর আমাকে অবশ্যই একটা নতুন কিছু পড়তে হতো। মাঝেমধ্যেই তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম গত এক সপ্তাহে আমার কেন তেমন অগ্রগতি হয়নি, আর তিনি বলতেন এতে নিরুৎসাহিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

পরে নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে নতুন নোবেল বিজয়ীদের সম্পর্কে রথ বলেন, তাঁরা কেবল নিলাম বোঝার উপায় গভীরভাবে পরিবর্তন করেনি—কীভাবে জিনিস নিলাম হয় সেই রীতিরও পরিবর্তন করেছেন। তাঁরা দুজন হলেন বর্তমান যুগের অর্থনীতির মহান তাত্ত্বিক।

এমনকি নিজের ব্লগে রথ লেখেন, এটাকে কি সেরা নোবেল জুটি বলা যায় না? রবার্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য কিংবদন্তি উপদেষ্টা। নোবেল বিজয়ী পল হলো রবার্টের তৃতীয় ছাত্র। তাঁকে তো নোবেল রাজবংশের পিতৃপুরুষ বলাই যায়। হয়তো ২০২৪ সালের মধ্যে আরও দেখতে পাব আমরা। আমার অভিনন্দন জানাতে পারব। রথ আরও বলেন, ‘আমার ছাত্রদের নিয়ে বরাবরই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি । তবে আজ আমি বলব, রবার্ট উইলসনকে আমার শিক্ষক ও বন্ধু হিসেবে এবং পলকে আমার বন্ধু ও সহকর্মী হিসেবে পেয়ে আমি কতটা সৌভাগ্যবান।’

মন্তব্য পড়ুন 0