default-image

ইউরোপিয়ান সুপার লিগ নিয়ে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে ইউরোপের ফুটবলজগতে। নানা চাপে শেষমেশ ইংল্যান্ডের ছয় ক্লাবই এই লিগ থেকে সরে এসেছে। এখন এই লিগের ভবিষ্যৎ নিয়েই তৈরি হয়েছে শঙ্কা। সমর্থক, ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক চাপের মুখে এই লিগ প্রায় বাতিল হওয়ার পথে।

কিন্তু কেন এই সুপার লিগের উত্থাপন হয়েছিল, তা নিয়ে ঘোর এখনো কাটেনি অনেকের। জানা গেছে, এর সঙ্গে বিপুল অর্থের যোগ আছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যান এই লিগে ৬০০ কোটি ডলার অর্থায়ন নিয়ে সামনে এসেছিল।

ইউরোপের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই লিগের প্রতিটি দল শুরুতে ৪০ কোটি ডলার করে পাবে, শক্তিশালী আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তোলাই যার লক্ষ্য। বায়ার্ন মিউনিখ শেষবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে যা পেয়েছিল, এই অর্থ তার চার গুণ এবং মনে রাখতে হবে, এটা শুধুই শুরু। এর পরে রেকর্ড মূল্যে টিভিস্বত্ব বিক্রির বিষয়টিও রয়েছে। ।

অর্থাৎ ইউরোপের ফুটবল লিগের চেয়েও এই সুপার লিগ অনেক বেশি টাকার ডালি নিয়ে বসতে চেয়েছিল।

মূল বিষয়টা হলো, বড় ক্লাবগুলো কী মনে করে এটি করতে চেয়েছিল। আসলে তারা মনে করে, টিভিস্বত্ব থেকে তাদের আরও বেশি অর্থ পাওয়া উচিত। ছোট ক্লাবের সঙ্গে ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে হচ্ছে বলে তারা যা পাচ্ছে তা যথেষ্ট নয় বলে তাদের মত। সুপার লিগে বাছাই করা সব সেরা দল খেলবে, সব বড় বড় দলের খেলা বলে টিভিস্বত্বের দর আরও বাড়বে। ক্লাবগুলোর প্রাপ্ত অর্থের অংশও অনেক বেশি হবে। তার সঙ্গে বিজ্ঞাপন থেকে আসা বিপুল অর্থও যোগ হবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজকে এই লিগ তৈরির পেছনে মূল কলকাঠি নেড়েছিলেন। তিনিই বিদ্রোহী লিগের প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন। তবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বড় ক্লাবগুলো এখন মার্কিন মালিকদের হাতে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, আর্সেনালের প্রধান মালিকেরা মার্কিন ধনকুবের।

এই লিগের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। তবে এর বিনিয়োগকারী হিসেবে শোনা গিয়েছিল মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানের নাম। তাই এটা নতুন মার্কিন অভিযান কি না, তা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে।

জেপি মরগ্যান ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছিল, তারা এই লিগে ৬০০ কোটি ডলার অর্থায়ন করছে। ‘কি ক্যাপিটাল’ নামের আরেক বিনিয়োগ কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে জেপি মরগ্যান এই লিগে বিনিয়োগ করার কথা জানায়। ‘কি ক্যাপিটাল’-এর একজন মালিক হচ্ছেন স্প্যানিশ ব্যবসায়ী বোর্জা প্রাডো। তিনি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের ব্যক্তিগত বন্ধু।

কেন জেপি মরগ্যানের এই লিগে আগ্রহ তা আলোচনার বিষয়ই বটে। তবে এবারই প্রথম নয়, জেপি মরগ্যান এর আগেও এ ধরনের এলিট ফুটবল লিগের প্রস্তাব দিয়েছিল। দ্য ফাইনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এবারের ঘটনা অনেকটা জেপি মরগ্যানের ‘ক্যু’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ এই চুক্তিটি যদি হতো তাহলে এটি হতো বিশ্বের ক্রীড়া ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ চুক্তি। মনে করা হচ্ছে এই ঋণের ওপর ব্যাংকটি ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদের হার নির্ধারণ করবে।

ফুটবলের আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে ডিলয়েট নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর পরিচালক টিম ব্রিজ বলেন, অর্থায়ন চুক্তিটি এখন পর্যন্ত অন্যতম বৃহত্তম চুক্তি এবং একটি ভূমিকম্পের মতো।

আসলে কয়েক বছর ধরেই এই সব লিগে টিভিস্বত্বের দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা এটি। যা বেসরকারি ইক্যুইটি বিনিয়োগকারী, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল সহ ব্যাংক ঋণ দিতে আগ্রহীদের আকর্ষণ করেছে। টিম ব্রিজ মনে করেন, জেপি মরগ্যান হলো আমেরিকার বৃহত্তম ব্যাংক, যার ব্যালেন্স শিট ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের। তারাও তাই এই বাজার দখলে নিতে উঠে পড়ে লেগেছে।

তবে এই লিগ ইউরোপের ফুটবলজগতে বৈষম্য বৃদ্ধি করবে বলেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। ব্যাপারটা এত গুরুতর পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বোরিস জনসন টুইট করে বলেন, ‘এই লিগ ফুটবলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে। ফুটবল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা তা সমর্থন করব’।

এদিকে এই লিগের খবরে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের শেয়ার মূল্য ৯ শতাংশ ও মিরান স্টক এক্সচেঞ্জে জুভেন্টাসের শেয়ার মূল্য ১৮ শতাংশ বেড়ে যায়। তবে গতকাল আবার লিগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় শেয়ারের দর পড়ে যায়।

অনেকেই মনে করছেন, করোনা মহামারিতে খেলাধুলাও মন্দার কবলে পড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের ক্লাবগুলো লোকসানে চলছে। এই অবস্থায় সব ক্লাবই আর্থিক মুনাফার দিকে ঝুঁকছে। সুপার লিগের বিপুল অর্থের টোপ তাই তারা দূরে ঠেলতে চায়নি।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন