পশ্চিমা দেশগুলো এবার সরাসরি যুদ্ধে জড়াচ্ছে না, বরং তারা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাশিয়াকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। ফলে যত নিষেধাজ্ঞা এ পর্যন্ত তারা দিয়েছে, এটাই শেষ নয় বলে ধারণা করা যায়। ভবিষ্যতে তারা আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। এই পরিস্থিতিতে গোল্ডম্যান স্যাকস বলেছে, এ বছর রাশিয়ার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নয়, বরং ৭ শতাংশ সংকোচন হতে পারে। এর আগে তাদের পূর্বাভাস ছিল, চলতি বছর রাশিয়ার ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে।

কোভিডের অভিঘাতে ২০২০ সালে রুশ অর্থনীতির প্রায় ৩ শতাংশ সংকোচন হয়। এরপর ২০২১ সালে তাদের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি।

তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সংকোচনের তেমন একটা প্রভাব পড়বে না বলেই ধারণা করা যায়। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা বলেন, রাশিয়া এখন আর বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় খেলোয়াড় নয়। এখন তারা বিশ্বের একাদশ বৃহত্তম অর্থনীতি। তাদের জিডিপির আকার দেড় ট্রিলিয়ন (এক ট্রিলিয়নে এক লাখ কোটি) ডলারের কম, যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ১৪ ভাগের ১ ভাগ। ফলে বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তারা বড় অংশীদার নয়।

তবে ইউক্রেনে রুশ সেনারা প্রবেশের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলারে উঠে গেছে। জ্বালানির বাজারে তার একচ্ছত্র আধিপত্য রাশিয়ার। তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ।

বলা যায়, যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির চিন্তার মূল কারণ হচ্ছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। বিশ্ব অর্থনীতি এখন কোভিডের প্রভাব কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, জ্বালানি তেলের দাম আরও কিছুদিন এভাবে বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। ইতিমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সারা পৃথিবীর মানুষের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই এখন ৩০–৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে বিশ্ব অর্থনীতির হোঁচট খাওয়ার শঙ্কা প্রবল।

যুদ্ধ ২০২৩ সাল পর্যন্ত চললে এবং পশ্চিমারা আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথবা রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিলে চলতি বছর রুশ অর্থনীতি ৭ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইনেস ম্যাকফি বলেন, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে কী প্রভাব পড়বে, তা আগেভাগে ধারণা করা মুশকিল, কারণ যুদ্ধের পরিস্থিতি ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে। তবে ধরে নিচ্ছি যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই দুরবস্থা আরও দীর্ঘায়ত হবে।

নিষেধাজ্ঞা

যুদ্ধ শুরুর পরপরই রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ‘সুইফট’ ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেন, কয়েকটি রুশ ব্যাংককে সুইফট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ওই ব্যাংকগুলো গোটা বিশ্বে আর কাজ করতে পারবে না। ধাক্কা খাবে রাশিয়ার আমদানি-রপ্তানি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উরসুলা।

ইউক্রেনে আক্রমণের বিষয়ে কথা বলতে শুরু করেছে নামীদামি অন্যান্য ব্র্যান্ডও। প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপল রাশিয়ায় সব পণ্য বিক্রি স্থগিত করেছে। ফ্যাশনের খুচরা বিক্রেতা অপর প্রতিষ্ঠান অ্যাসোস রাশিয়ায় গ্রাহকদের আর পরিষেবা দেবে না বলে গতকাল জানিয়েছে। আরেক বৈশ্বিক ব্র্যান্ড নাইকি এখনো ইউক্রেন সংকটের বিষয়ে সরাসরি কথা বলেনি। তবে রাশিয়ার গ্রাহকেরা আর অনলাইনে তাদের পণ্য কিনতে পারছেন না।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন