বিজ্ঞাপন

চলতি জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাংসের চাহিদা এক বছর আগের সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ কমেছে। ইউরোপে চলতি বছর মাংসের সামগ্রিক চাহিদা ১ শতাংশ কমবে বলে পূর্বাভাস। যে আর্জেন্টিনায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মাংসাশী মানুষের বসবাস, সেই দেশেও গরুর মাংসের চাহিদা গত এক বছরে ৪ শতাংশ কমেছে। মিট রিয়েলিট ডটঅর্গে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে চাহিদা হ্রাসের সে রকম পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার জরিপে বলা হয়েছে, শহরের বস্তিতে মানুষের আয় অনেকটাই কমেছে। আর তাতে তারা খাবারের খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছে। খাবারের খরচ কমানো মানে আমিষভোগ হ্রাস।

একই সঙ্গে মাংসের দাম বাড়ারও প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো সারা বিশ্বেই মাংসের দাম বাড়তির দিকে। কারণ হিসেবে বিক্রেতারাও জানাচ্ছেন চাহিদা কমার কথাই। তাঁদের কথায়, ‘মাংসের চাহিদা কমেছে। অথচ মুরগি লালন-পালনের খরচ একই আছে। আবার দেশে দেশে এখনো আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ লকডাউন চলছে। তাতে সরবরাহের খরচও বেশ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি। এগুলোই দাম বাড়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছে মাংস বিক্রেতাদের একাংশ।
মাংসের দামের এই হঠাৎ বৃদ্ধি বা চাহিদায় ঘাটতির এই ধারা বিশেষজ্ঞদের শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে।

বাজার পর্যবেক্ষকদের মত, মাংস খাওয়ার প্রবণতা কমছে, সেটা যেমন চিন্তার বিষয়, তেমনই আরও একটা বিষয় উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো, তা হলো মানুষের মধ্যে নিরামিষ খাওয়ার প্রবণতাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। মাংসের বদলে প্রোটিনসমৃদ্ধ নিরামিষ খাবার বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে তারা। এতে সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না।

মূলত গত এক বছরে মহামারির সময় থেকেই এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে বাজার বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বিষয়টিকে পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝিয়েছেন তাঁরা।

পরিসংখ্যানগত দিক থেকে ব্যাপারটা অনেক বড় না হলেও ব্যাপারটা অর্থনৈতিকভাবে আশঙ্কা জাগানোর মতোই। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মাংসের বাজার হলো এমন একটি বাজার, যেখানে চাহিদা সাধারণত কমে না, বরং মাঝেমধ্যেই বেড়ে গিয়ে রেকর্ড উচ্চতা ছুঁয়ে ফেলে। এত দিন তা উত্তরোত্তর বেড়েছেও। মাংসের দাম কমা বা বৃদ্ধি পাওয়ার সে রকম কোনো প্রভাব এত দিন পড়েনি বাজারে, কিন্তু এখন পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের কথায়, মহামারির পর থেকে তৈরি হওয়া এই প্রবণতার দুটি কারণ থাকতে পারে। এক, মাংসের দাম বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অবনতি। মহামারির প্রভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে যে পরিবারের রাতের খাবারের থালায় নিয়মিত মাংস থাকত, তারা নিয়মিত মাংস কিনতে পারছে না। আমিষ খেলে বেছে নিচ্ছে অল্প দামের বিকল্প। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিরামিষ বিকল্পই বেছে নিতে দেখা যাচ্ছে তাদের।

গত অক্টোবর থেকেই ব্রাজিল থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে মাংসের বিক্রি কমেছে। মহামারি ও তার জেরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে ডিমের মতো বিকল্প প্রোটিনও কিনতে পারছে না অনেকে।

দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, অনেকে স্রেফ পরিবেশ সচেতনতা থেকে মাংস খাওয়া বন্ধ করেছে। প্রাণী হত্যা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো নানা কারণে তারা সম্পূর্ণ নিরামিষাশী হচ্ছে। এমনকি অনেক কম বয়সীর মধ্যেও এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা চিন্তায় ফেলেছে বাজার অর্থনীতিবিদদের।

পরিসংখ্যান বলছে, গত অক্টোবর থেকেই ব্রাজিল থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে মাংসের বিক্রি কমেছে। মহামারি ও তার জেরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে ডিমের মতো বিকল্প প্রোটিনও কিনতে পারছে না অনেকে। বদলে ভাত, রুটি, নুডলস দিয়েই নিরামিষে পেট ভরাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের অনেক মানুষ।

এই পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন মুরগি ও গরুর খামারিরা। উন্নয়নশীল দেশে অনেক টাকা বিনিয়োগ হয়েছে এসব খামারে। ফলে এখন দীর্ঘ মেয়াদে চাহিদা কম থাকলে বা সরবরাহে ঘাটতি থাকলে ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

মহামারির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গোমাংসের দাম ৬ শতাংশ বেড়েছে। মুরগির মাংসের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ। শূকরের মাংসের দাম ১৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ৪৮ বছর বয়সী নিউইয়র্কের বাসিন্দা ইউডেলিয়া পেনা মিট রিয়েলিটিকে বলেন, এই বিপুল মূল্যবৃদ্ধির কারণে মাংস খাওয়া ভুলতে বসেছে তাঁর পরিবার। মহামারিতে কাজ হারিয়ে এখন তাঁদের পরিবারে রোজগেরে বলতে একজন। ফলে আগে খাবারের জন্য তাঁরা যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেন, তার অর্ধেকও খরচ করতে পারছেন না এখন। পেনার কথায়, ‘আগে প্রতিদিন দুই বেলা মুরগির মাংস আনতাম। এখন সপ্তাহে একটা মুরগি এনে সেটা অর্ধেক কেটে খরচ করি।’

পুষ্টিবিষয়ক প্রধান নাওকো ইয়ামামোতোর কথায়, ‘বিশ্বের বহু দেশে এখনো শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে। প্রাণিজ প্রোটিন তাদের দ্রুত সুস্থ করতে সক্ষম। নিরামিষ প্রোটিন বিকল্প খারাপ, তা বলছি না। তবে প্রাণিজ প্রোটিন এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর। তাই প্রাণিজ প্রোটিন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বোধ হয় ঠিক হবে না।’

তবে পেনাদের নিয়ে বেশি চিন্তিত নন অর্থনীতি বিশারদেরা। তাঁদের আশঙ্কা, নিরামিষাশীদের নিয়ে। গত এক বছরে আমিষ না খেতে পেরে এখন বহু গ্রাহকই মাংস ছেড়ে নিরামিষ বিকল্প বেছে নিচ্ছে। তারা অবশ্য বলছে, এতে তারা আগের চেয়ে সুস্থ আছে।

অন্যদিকে জাতিসংঘের পুষ্টিবিষয়ক প্রধান নাওকো ইয়ামামোতোর কথায়, ‘বিশ্বের বহু দেশে এখনো শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে। প্রাণিজ প্রোটিন তাদের দ্রুত সুস্থ করতে সক্ষম। নিরামিষ প্রোটিন বিকল্প খারাপ, তা বলছি না। তবে প্রাণিজ প্রোটিন এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর। তাই প্রাণিজ প্রোটিন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বোধ হয় ঠিক হবে না।’

শহরতলিতে তো বটেই লন্ডন, নিউইয়র্কের মতো শহরেও অনেকে বাড়ির পাশে এক চিলতে জায়গায় সবজি চাষ করছেন। বাজারেও সবজি ও প্রোটিনের নিরামিষ বিকল্পের চাহিদা ৭০ শতাংশর বেশি বেড়েছে। যে পরিবেশের কথা বিবেচনা করে এসব করা হচ্ছে, তা–ও ঠিক নয়। কারণ, কৃষি অনেক ক্ষেত্রে পরিবহনের চেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়ায়। ফলে হঠাৎ করেই মাংস ছেড়ে বিশ্ববাসীর এমন ডাল-ভাতে ফেরার প্রবণতা পরিবেশের পক্ষে উপকারী না-ও হতে পারে।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন