default-image

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার পর আরও ১২ বছর বাণিজ্যসুবিধা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও)। গত ডিসেম্বর মাসে এলডিসির চেয়ার হিসেবে আফ্রিকার দেশ চাদ ডব্লিউটিওর সাধারণ পরিষদে (জেনারেল কাউন্সিল) এই প্রস্তাব করেছে। এখন প্রস্তাবটি নিয়ে ডব্লিউটিওতে স্বল্পোন্নত দেশের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু করেছেন। আগামী নভেম্বরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠেয় ডব্লিউটিওর মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় ১২ বছর বাণিজ্যসুবিধা অব্যাহত রাখার প্রস্তাবটি অ্যাজেন্ডাভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

এই বাণিজ্যসুবিধার প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের নাম সুপারিশ করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর পক্ষে তাদের প্রস্তাব হলো, যেকোনো দেশ এলডিসি থেকে বের হলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ১২ বছর এলডিসির বাণিজ্যসুবিধা অব্যাহত রাখা। ডব্লিউটিওতে এ প্রস্তাব গৃহীত হলে বাংলাদেশ ২০৩৮ সাল পর্যন্ত এলডিসি হিসেবে প্রাপ্ত বাণিজ্যসুবিধা পেতে পারে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিডিপি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চাদের প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডব্লিউটিওর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাণিজ্যসুবিধা হারালে এলডিসি উত্তরণের পথে থাকা ১২টি দেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হবে, এর ৯০ শতাংশই হবে বাংলাদেশের। তাই চাদের প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের পক্ষে বাংলাদেশ জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ডব্লিউটিওতে যা হচ্ছে

গত ১, ২ ও ৪ মার্চ জেনেভায় অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিওর সাধারণ পরিষদের সভায় চাদের প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। চাদের এই প্রস্তাবে কোনো সদস্যদেশ বিরোধিতা করেনি।

গত ১ মার্চ ডব্লিউটিওর নতুন মহাপরিচালক হিসেবে এনগোজি ওকোনজা ইওয়েলা দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনিই প্রথম নারী এবং আফ্রিকান মহাপরিচালক। দায়িত্ব নিয়ে মহাপরিচালক হিসেবে বিভিন্ন বাণিজ্য আলোচনায় এলডিসি উত্তরণকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

ডব্লিউটিওর জেনেভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলো চাদের প্রস্তাবের পক্ষে এককাট্টা হয়েছে। এখন স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপটি এ নিয়ে বড় দেশগুলোর সঙ্গে বসবে। এলডিসিভুক্ত দেশগুলো বলছে, সারা বিশ্বে যত বাণিজ্য হয়, তার ১ শতাংশের কম অংশীদার হলো এলডিসিভুক্ত দেশগুলো। তাই এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও কোনো দেশকে বাণিজ্যসুবিধা দেওয়া হলে বিশ্ববাণিজ্যের বড় কোনো বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন হবে না।

ডব্লিউটিওতে স্বল্পোন্নত দেশের পক্ষে এলডিসি উত্তরণবিষয়ক ফোকাল কর্মকর্তা দেবব্রত চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ডব্লিউটিওর মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় প্রস্তাবটি অ্যাজেন্ডা হিসেবে রাখার চেষ্টা চলছে। আমরা আশাবাদী, তবে এ ধরনের প্রস্তাবের চূড়ান্ত পরিণতি পাওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ।’ তিনি ডব্লিউটিওতে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

চ্যালেঞ্জের মুখে যা

এলডিসি থেকে বের হলে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে রপ্তানি খাত। কারণ, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যসুবিধা পায়। ২০২৬ সালের পর এসব সুবিধা বন্ধ হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপির আওতায় এই শুল্কমুক্ত সুবিধা আরও তিন বছর থাকবে।

বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে এখন আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের জন্য অর্থ দিতে হয় না। এই সুবিধা দেওয়ার কারণ হলো, মেধাস্বত্বের (পেটেন্ট) ওপর অর্থ পরিশোধ করা হলে ওষুধের দাম বাড়তে পারে। তাতে গরিব মানুষের স্বল্প মূল্যে ওষুধ পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এখন বাংলাদেশ শিল্প ও কৃষি খাতের বিভিন্ন পণ্য বা সেবার ওপর ভর্তুকি দিতে পারে। রপ্তানি আয় বা রেমিট্যান্স আনায় নগদ সহায়তা দেয়। এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে এসব সুবিধা নিয়ে আপত্তি উঠতে পারে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া কঠিন হবে।

এলডিসি কারা

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে উন্নয়নশীল ও উন্নত—এই দুই শ্রেণিতে সব দেশকে ভাগ করে থাকে জাতিসংঘ। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যে দেশগুলো তুলনামূলক দুর্বল, তাদের নিয়ে ১৯৭১ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা হয়। স্বল্পোন্নত দেশ হলেও এসব দেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় থাকে।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন