default-image

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস ১৯৩০-এর দশকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, প্রযুক্তির কল্যাণে একসময় মানুষের কর্মসময় কমে যাবে। কমতে কমতে তা দাঁড়াবে সপ্তাহে ১৫ ঘণ্টায়। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। কিন্তু মানুষের কর্মসময় না কমে উল্টো আরও বেড়েছে। উন্নয়নশীল দেশে রাস্তায় অনেক সময় চলে যাচ্ছে।

২০২০ সালে যেন সবকিছুই ভোজবাজির মতো বদলে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিডের মধ্যে ঘর থেকে কাজ করার যে প্রবণতা গড়ে উঠেছে, তা আমাদের জীবন অনেকটাই বদলে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত বছরের শুরুতে দূর থেকে কাজ করার সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছিল। নতুন নয়, অনেক দিন ধরেই তা ঘটছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ১২ শতাংশ কর্মী ঘর থেকে পূর্ণকালীন কাজ করতেন। যুক্তরাজ্যে এই সংখ্যাটা ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। কোভিডের ধাক্কায় যে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘর থেকে কাজ করতে শুরু করবেন, সেটা একপ্রকার অচিন্তনীয়ই ছিল।

কোভিড আসার পরই বোঝা গেল, এত মানুষ একসঙ্গে ঘর থেকে কাজ করতে পারে। কর্মসংস্কৃতি যেন মুহূর্তেই বদলে গেল। অফিসে যাওয়া, সশরীর বৈঠক করা, দৈনিক রাস্তায় সময় ব্যয় করা—এসব দ্রুত বদলে গেল। তবে একই সঙ্গে নয়টা-পাঁচটা কাজ করা, ছুটি ও ব্যক্তিগত জীবনও হুমকির মুখে পড়ল। ঘর থেকে কাজ করার কারণে রুটিন এলোমেলো হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন

পুরোনো রীতিনীতির বদলে নতুন রীতিনীতিতে মানুষ অভ্যস্ত হতে শুরু করল। জুম বৈঠকের চালচলন, ই-মেইল যোগাযোগে আরও সহানুভূতিশীল হওয়া, এ রকম নানা পরিবর্তন সেই সময় নিয়ে আসতে হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, উন্নত বিশ্ব বড়দিনের সময় মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যাওয়ার প্রত্যাশা করেছিল, যেটা এখনো সুদূর বাস্তবতা।

প্রযুক্তির প্রভাব

প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ লকডাউনের মধ্যে ঘরে বসে কাজ করতে পেরেছে। কিন্তু এতে যা হয়েছে, তা হলো মানুষের কাজ ও জীবনের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে। সারা দিনই কমবেশি কাজ নিয়ে থাকতে হয়েছে, নাহয় ই-মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপে বুঁদ হয়ে থাকতে হয়েছে। জুমে বৈঠক করতে করতে অনেকে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
তবে এর মধ্যেও টুইটারসহ ১৭টি কোম্পানি ঘোষণা দিয়েছে, কর্মীরা চাইলে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘর থেকে কাজ করতে পারেন।

মহামারির আগে থেকেই সার্বক্ষণিক কাজ করা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছিল। সমাজবিজ্ঞানীরা বলা শুরু করেছিলেন, কর্মীদের কর্মী-স্মার্টফোন সংকরে পরিণত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালে আইন করে ফরাসি কর্মীদের এই অধিকার দেওয়া হয়েছিল যে কর্মসময়ের বাইরে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল গ্রহণ করতে হবে না।

বাস্তবতা হচ্ছে, লকডাউনের মধ্যে কর্মীদের কার্যালয়ে যেতে হয়নি ঠিক, কিন্তু সেই সময়টা তাঁরা ব্যয় করেছেন ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা দেখায়। সব দেশের বাস্তবতা অনেকটা এ রকম। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তো পরিস্থিতি এমন ছিল যে কর্মীদের ঘর থেকে কাজের সুযোগ দেওয়া অনেকটা বিশেষ সুবিধা দেওয়া, আকারে-ইঙ্গিতে তাঁদের এটা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক কর্মী চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতর্কিত কাজ করেছেন। ফলে কর্মদিবস যে কখন শেষ হবে, তা কেউ জানত না।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নৃতাত্ত্বিক ডেভ কুক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক ব্লগে লিখেছেন, কাজ-জীবনের ভারসাম্যে গড়বড় হলে তাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে কর্ম ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য আনার বিকল্প নেই। প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন