ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের দুই প্রতিযোগী দেশ ভারত ও ভিয়েতনাম। এ চুক্তি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
এমনই অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ব্যবসায়ী, গবেষক ও সরকারের মন্ত্রীরা বলেছেন, প্রতিযোগী দুই দেশের প্রস্তাবিত এফটিএ বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে না। বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রম অসন্তোষ, কর্মপরিবেশ উন্নয়নের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোই বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের রপ্তানিতে ইইউ-ভারত এবং ইইউ-ভিয়েতনাম এফটিএর সম্ভাব্য প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনারে এসব অভিমত উঠে আসে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিজিএমইএ ভবন মিলনায়তনে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারের প্রধান অতিথি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইইউর সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনাম এফটিএ করলেও বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। এখন অবরোধের নামে দেশে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। ভারত ও ভিয়েতনামে তো এসব হয় না।
বিশেষ অতিথি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘পোশাক রপ্তানির দিক থেকে আমি ভিয়েতনামকে হুমকি মনে করি না। কারণ, সেখানে যন্ত্রপাতি, পাদুকার মতো শিল্পগুলো পোশাকের চেয়েও বড়। সে কারণে ইইউর সঙ্গে এফটিএ করলে তার প্রভাব হয়তো দেশের পোশাক রপ্তানির ওপর পড়বে না। তবে অন্যান্য শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
শাহরিয়ার আলম বলেন, এত সম্ভাবনা থাকার পরও বাংলাদেশ এখনো একটিও এফটিএ করতে পারেনি। এখন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় এফটিএ করার দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।
বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান বাজারই হলো ইইউ। সেখানে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পায়। তবে ইইউ এখন একদিকে জিএসপি সুবিধার পরিমাণ কমাচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারকে জিএসপি প্লাস সুবিধা দিচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন করতে না পারলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বিএফটিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মোস্তফা আবিদ খান বলেন, ইইউতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক হলেও ভারত ও ভিয়েতনামের প্রধান পণ্য তা নয়। তবে তাদের প্রধান ১০ রপ্তানি পণ্যে পোশাকও আছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৫৫ শতাংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে। আবার ইইউতে রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারত ও ভিয়েতনামকে ৯ শতাংশের বেশি শুল্ক দিতে হয়। বাংলাদেশকে কোনো শুল্ক দিতে হয় না। এই অবস্থায় ভারত ও ভিয়েতনাম ইইউর সঙ্গে এফটিএ করলে তারাও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এটা বাংলাদেশের নিট পোশাক ও পাদুকা রপ্তানির ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে।
তবে বাংলাদেশে ইইউর কার্যালয়ের বাণিজ্য উপদেষ্টা জিল্লুল হাই রাজী বলেন, ভারত কিংবা ভিয়েতনামের সঙ্গে ইইউর এফটিএ হলেও বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ, দুটি দেশই এখন পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানির দিকে বেশি মনোযোগী।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ভারতের ব্যাপারে আমি শঙ্কিত নই। আমার শঙ্কা ভিয়েতনামকে নিয়ে। কারণ, এফটিএ করতে পারলে তারা রপ্তানি কয়েক গুণ বাড়িয়ে ফেলবে। এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানিতে।’
বিএফটিআইয়ের সাবেক প্রধান নির্বাহী মজিবুর রহমান বলেন, ‘ভিয়েতনাম কোনোভাবেই আমাদের পোশাকের প্রতিদ্বন্দ্বী না। কারণ, তারা উচ্চমূল্যের পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানি করে। আমরা নিম্নমূল্যের পোশাক রপ্তানি করি। আমাদের প্রধান হুমকি ভারত ও কম্বোডিয়া।’
বিজিএমইএর সহসভাপতি রিয়াজ-বিন-মাহমুদের সঞ্চালনায় সেমিনারে সাবেক বাণিজ্যসচিব সোহেল আহমেদ, এনবিআরের সদস্য নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন আহমেদ, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার প্রমুখ বক্তব্য দেন।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন