ভারতে প্রয়োজনীয় মোট জ্বালানির ২৮ শতাংশ আসে খনিজ তেল এবং ৭ শতাংশ গ্যাস থেকে। ২০৩০ সালের মধ্যে গ্যাসের চাহিদা দ্বিগুণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সে দিক থেকে দেখলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গ্যাস-সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোতে যে ৭৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বলে শোনা যাচ্ছে, তার প্রতিফলন রান্নার গ্যাসে পড়েছে এবং তার দাম দ্বিগুণ হয়েছে ভারতে। এসবের ‘স্পট প্রাইস’ (কোনো পণ্যের সাম্প্রতিক মূল্য, যার মধ্যে তাৎক্ষণিক ক্রয়, বিক্রয় ও সরবরাহকে ধরা হয়) তিন গুণ বেড়েছে। অটো ও ট্যাক্সিচালক, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার ব্যবহারকারীরা এই মূল্যবৃদ্ধির আঁচ ভালোমতোই টের পাচ্ছেন।সরকার এসবে ভর্তুকি না দিলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠবে।

এই ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলো, যাদের মধ্যে জার্মানি অন্যতম। শিল্পায়িত দেশ জার্মানির জ্বালানির প্রধান সরবরাহকারী মস্কো। রুশ তেল ও গ্যাস সরবরাহে আকস্মিক ছেদ অনিবার্যভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে ডেকে আনবে এবং তার সূত্র ধরে (নির্ভর করছে কতখানি দক্ষতার সঙ্গে বিষয়টির সমাধান করা যায়) অনিবার্যভাবেই সে দেশে রাশিয়ার মতোই মন্দাবস্থা দেখা দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ইংল্যান্ডে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বরিস জনসনের সরকার হয়তো তার দিকে ধেয়ে আসা কেলেঙ্কারির অভিযোগ কাটিয়ে উঠতে পারবে, কিন্তু গ্যাসের দাম আর ক্রমবর্ধমান কর থেকে উদ্ভূত সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন হয়েই যাবে।

ইউরোপের মতো না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা খুব সুবিধার নয়। গত এক মাসে সেখানে পেট্রলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, গ্যালনপিছু চার ডলারের বেশি বেড়েছে। মার্কিন অর্থনীতিও ভালোভাবে সমস্যা টের পাচ্ছে। ‘নেটফ্লিক্স’ রুশ গ্রাহকদের জন্য দরজা বন্ধ করায় তাদের শেয়ারের দাম অনেকটাই পড়ে গেছে। অন্য যেসব পশ্চিমা সংস্থা রাশিয়ার প্রতি বিরূপ আচরণ করছে, তারাও বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। শেয়ার সূচকের পতন অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এরপরও মনে রাখতে হবে, যুদ্ধের নিজস্ব খরচ রয়েছে। অর্থনৈতিক অবরোধ অনির্দিষ্টকালের জন্য চললে রাশিয়ার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। অবরোধ দীর্ঘমেয়াদি না হলেও কি রুশ অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে বা ইউক্রেনের কী হবে—এসব প্রশ্ন এখন আকাশে-বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ইউক্রেনের যুদ্ধের খরচ ইতিমধ্যে ৬০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যুদ্ধের আগে ছিল ১৮০ বিলিয়ন ডলার। কিভ এই বিপুল অর্থ শোধ দেবে কীভাবে। একাধারে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বেকারত্ব বৃদ্ধি ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখে পশ্চিম তথা আমেরিকা কি তার তহবিল ইউক্রেনের জন্য উন্মুক্ত করবে। তাদের করদাতারা কি এমন কাজ সমর্থন করবেন।

এর সঙ্গেই যুক্ত হতে পারে রাজনৈতিক বিপর্যয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মারি লো পেন (নির্বাচনী প্রচারের মূল জায়গা মূল্যস্ফীতি বিরোধিতা) আজ রোববার হয়তো এমানুয়েল মাখোঁকে পরাজিত করতে না পারলেও দুজনের ভোটের ব্যবধান অবশ্যই কমবে। প্যারিসে পাঁচ বছর পর ইউরো-অর্থনীতি বিষয়ে সন্দিহান এক সরকারের আগমনের পদধ্বনি হয়তো ইউরোপ শুনতে পাবে। আমেরিকায় নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিপর্যয় দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। দুই বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকেও অসম্ভব বলে মনে হবে না। আজকের এই সব সমস্যা আগামী দিনে ওয়েস্টার্ন অ্যালায়েন্সের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলিতে জাতীয়তাবাদী ও বিশ্বায়ন-বিরোধী শক্তির উত্থানকে স্পষ্ট করে তুলবে। এক রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কিন্তু থেকেই যাবে।

পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যদি রাশিয়াকে পশ্চিম ইউরোপে একটি ‘বাফার জোন’ দেওয়া যেত, তা হলে হয়তো এই লোকক্ষয়, অর্থ ক্ষতি ও উদ্বাস্তু সমস্যা এড়ানো সম্ভব হতো।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন