default-image

২০২১ সাল কেবল শুরু হলো। কোভিড-১৯-এ টিকাদানও শুরু হয়েছে। তাই আকাশে-বাতাসে আশার বাণী শোনা যাচ্ছে। ফলে এখন আর মহামারির ভয়ে চোখ ঢেকে রাখার প্রয়োজন পড়বে না। এই পরিস্থিতিতে নতুন দশকও শুরু হচ্ছে। কথা হচ্ছে, এই দশকে কোন দেশের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হবে।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের এক নিবন্ধে লিখেছেন, তাঁর বাজির ঘোড়া হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও মেক্সিকো, যদিও সবার অবস্থা এক রকম নয়। দক্ষিণ কোরিয়া উন্নত দেশ। বিশ্বব্যাংকের ভাষায় ভিয়েতনাম হচ্ছে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ, ভারত ও বাংলাদেশের মতো। মেক্সিকো উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, আগামী ১০ বছরে এই দেশগুলো আশপাশের দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে।

এই তিনটি দেশের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে বাজি ধরা সবচেয়ে সহজ। সেই ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে এদের উন্নয়ন পর্ব শুরু হয়, যদিও ১৯৯৭ সালে পূর্ব এশিয়ার আর্থিক সংকটে এরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

কৌশিক বসু লিখেছেন, সাধারণত ধনী দেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা গরিব দেশগুলোর তুলনায় কম থাকে। তবে ধনী দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল—মূলত মানবসম্পদে বিনিয়োগের কারণে। ২০১৯ সালে প্রতি লাখ মানুষে ৩ হাজার ৩১৯টি পেটেন্ট আবেদন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। দ্বিতীয় স্থানে আছে জাপান—প্রতি ১০ লাখে ১ হাজার ৯৪৩। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সে সংখ্যাটা যথাক্রমে ৮৯০ ও ৮৬৯। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম দেশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া দেশব্যাপী ৫-জি প্রযুক্তি চালু করে। ২০২৬ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক ৫-জি বাজারের ১৫ শতাংশ করায়ত্ত করবে।

এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া বাজারের এক সমস্যা সমাধানে অনেকটা এগিয়ে গেছে, যেখানে অন্যান্য দেশ সেই সমস্যায় জর্জরিত। সেটা হলো, শিক্ষক নির্বাচন। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়-অ্যান্ড্রু নিউম্যান, ওদেদ গালোর ও জোসেফ জেরিয়া প্রমুখের গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলশিক্ষকদের প্রয়োজনের তুলনায় কম বেতন দেওয়া হয়। কৌশিক বসুর কাছে এর কারণ মনে হয়, ভালো শিক্ষার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মে টের পাওয়া যায়, বর্তমান প্রজন্মে নয়। সে জন্য ভালো শিক্ষকের কারণে অনেকটা ভালো জলবায়ু নীতির মতো-পরবর্তী প্রজন্ম লাভবান হয়।

ভারত এই রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে পারলে প্রবৃদ্ধিতে আবারও নেতৃত্ব দিতে পারবে। তবে বড় একটি ‘যদি’র ওপর নির্ভর করছে এটি।
কৌশিক বসু, সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক

দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে মেধাবী মানুষদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পেরেছে। স্কুলের শিক্ষকেরা সে দেশের সবচেয়ে ধনী মানুষদের কাতারে। চাকিল-ইয়ং নামের এক স্কুলশিক্ষক অনলাইনে গণিত পড়িয়ে বছরে ৮০ লাখ ডলার আয় করেছেন—এই তুলনা পাওয়া ভার।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন সমতামুখী ও অন্তর্মুখী সমাজ গঠনের চেষ্টা করছেন। তাতেও ভালো ফল মিলছে। প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন রাজকীয় ব্লু হাউস থেকে সিউল শহরের মধ্যে সাধারণ সরকারি কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা প্রতীকী ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কৌশিক বসুর ধারণা, দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু আয় আগামী ১০ বছরের মধ্যে জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে।

২০১০ সালে ভিয়েতনাম বিশ্বের তিনটি সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশের একটি। ভারত ও চীনের পরেই তার অবস্থান ছিল। তখন তার মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ২৯৭ ডলার। এরপর থেকে ভিয়েতনামের অগ্রগতি অব্যাহত আছে। এমনকি মাথাপিছু আয়ে তারা এখন ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ভিয়েতনামের এই অগ্রযাত্রার মূল নিহিত আছে ১৯৮৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অব ভিয়েতনামের ষষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেসে গৃহীত দই মই নীতিতে। এর মাধ্যমে তারা কেন্দ্রীয় অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে চলে আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা শুল্কহার কমিয়েছে। বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছে। পাশাপাশি মানবসম্পদে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সবচেয়ে সফল দেশগুলোর একটি হচ্ছে ভিয়েতনাম। এতে তাদের অর্থনীতি বাড়তি গতি পেয়েছে। কোভিডে প্রতি ১০ লাখে দেশটিতে মৃত্যু হয়েছে শূন্য দশমিক ৪। মহামারির মধ্যেও তাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। এমনকি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণেও তারা যেভাবে এগিয়ে আসছে, তাতে তারা বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

তবে মেক্সিকোর অবস্থা অত ভালো নয়। কোভিড মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে তারা। তবে প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ অব্রাডর (এএমএলও) ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে আশার আলো দেখা যাচ্ছে।

এদিকে ভারতের ব্যাপারটা ধাঁধার মতো। এই কয়েক বছর আগেও দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৯ শতাংশের মতো, ছিল সফলতার অনন্য নজির। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার কমছে। তা সত্ত্বেও ভারত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী উদীয়মান দেশ। দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশ্বমানের। ওষুধ খাতও শক্তিশালী। ছোট হলেও উচ্চশিক্ষিত কর্মী গোষ্ঠী আছে তাদের। কিন্তু বিভাজনের রাজনীতির কারণে দেশটি এগোতে পারছে না।

কৌশিক বসুর মত, ভারত এই রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে পারলে প্রবৃদ্ধিতে আবারও নেতৃত্ব দিতে পারবে। তবে বড় একটি ‘যদি’র ওপর নির্ভর করছে এটি।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন