১৯১২ সালে টাইটানিক জাহাজের প্রথম শ্রেণির কেবিনের ভাড়া ছিল ৩০ পাউন্ড, দ্য ইকোনমিস্ট-এর হিসাব অনুযায়ী এখনকার বাজারমূল্যে তা ৩ হাজার ৫০০ ডলার। সাধারণ ডেকের ভাড়াও নেহাত কম ছিল না। ভেবে দেখুন, ভ্রমণ করা কী দুঃসাধ্য ব্যাপারই না ছিল। তাই এক সময় সাধারণ মানুষের পক্ষে অন্য দেশে বা এমনকি দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। সে জন্য বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল থেকে যাঁরা এখনো শহরে যান, তাঁদের সম্পর্কে বলা হয়, অমুক ছেলেটা/মেয়েটা ‘বিদেশ বিভুঁইয়ে থাকে’।

তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে বিমান পরিবহন। এতে খরচও কমেছে। টাইটানিক জাহাজের মতো ভাড়া এখন আর গুনতে হয় না। সে কারণে মানুষের যাতায়াতও বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের কারণেও এটি হয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) হিসাব অনুসারে, ১৯৫০ সালে যেখানে মাত্র ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, সেখানে ২০১৯ সাল তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ কোটিতে। এসব মানুষের সিংহভাগই ছুটি কাটাতে বিদেশে যান। এই পর্যটকেরা ২০১৯ সালে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার ব্যয় করেছেন।

বিজ্ঞাপন

সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু কোভিডের অভিঘাতে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। ইউএনডব্লিউটিওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তাতে ভ্রমণকারীর সংখ্যা কমেছে ১০০ কোটি। ব্যয়ও কমেছে সেই অনুপাতে। ২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের পর ২০০৯ সালে এই খাতের যা ক্ষতি হয়েছিল, এটা তার চেয়েও ১০ গুণ। আর এই খাত যে কবে প্রাক্‌-মহামারি পর্যায়ে ফিরে যাবে, তা-ও অনিশ্চিত। টিকাদান কর্মসূচি চালু হয়েছে। তা সত্ত্বেও এই খাতের পুনরুদ্ধার একরকম অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন এ খাতের সংশ্লিষ্ট লোকজন। ধনী দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডি বলছে, পর্যটন খাতের চাহিদা সবার পরে প্রাক্‌-মহামারি পর্যায়ে ফেরত যাবে।

তবে ব্যক্তিগত ভ্রমণ একসময় স্বাভাবিক হলেও ব্যবসায়িক ভ্রমণ আর স্বাভাবিক না-ও হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট। জানুয়ারি মাসে গ্লোবাল বিজনেস ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের এক জরিপে দেখা গেছে, এই সংগঠনের ৭৯ শতাংশ সদস্য অধিকাংশ বা সব ব্যবসায়িক ভ্রমণ বাতিল করেছেন। ক্রেডিট সুসি বলছে, ২০২১ সালের ব্যবসায়িক ভ্রমণ ২০১৯ সালের তুলনায় ৬৫ শতাংশ হ্রাস পাবে। আবার মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস মনে করেন, ব্যবসায়িক ভ্রমণের অর্ধেকই আর থাকবে না। মার্কিন সিটি ব্যাংক মনে করে, এই সংখ্যাটা ২৫ শতাংশ হবে।

ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট বলছে, এর আগে যত বড় দুর্যোগ এসেছে, প্রতিবারই দেখা গেছে, ব্যবসায়িক ভ্রমণ স্বাভাবিক হতে সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক ভ্রমণ ১৩ শতাংশ হ্রাস পায়।

তবে সব খবর খারাপ নয়। ভ্রমণ কম হয়েছে বলে বাণিজ্যিক জেটের গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস পেয়েছে। যেসব জায়গায় মানুষ ভিড় করতে করতে বারোটা বাজিয়ে ফেলেছিল, সেই সব জায়গার প্রাণ-প্রকৃতি কিছুটা বিরতি পেয়েছে। সেখানে হয়তো আবার লতা-গুল্ম গজিয়ে উঠছে। আর যে অভিজ্ঞতা পর্যটনশিল্পের হলো, তাতে পর্যটনশিল্পের আরও উন্নতি হতেই পারে।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন