default-image

মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ফাইজার ও বায়োএনটেকের তৈরি টিকার সাফল্যের পেছনের গল্পটা আমাদের অনেকরই অজানা। জার্মান এক চিকিৎসক দম্পতির যৌথ গবেষণার সাফল্য এই টিকা, যার দিকে তাকিয়ে এখন সারা বিশ্ব। আর এই সাফল্য ওই দম্পতিকেও উঠিয়ে দিয়েছে জার্মানির শীর্ষ ১০০ ধনীর তালিকায়। 

গতকাল সোমবার ফাইজার ও বায়োএনটেকের পক্ষ থেকে  বলা হয়, কোভিড-১৯ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে সক্ষম তাদের টিকা। টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার প্রাথমিক বিশ্লেষণে এই সফলতা দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি জানিয়েছে, টিকা নিয়ে প্রাথমিক বিশ্লেষণে এর ৯০ শতাংশ কার্যকারিতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংস্থাগুলি জানিয়েছে, যে তারা এখনো পর্যন্ত কোনো গুরুতর সুরক্ষা উদ্বেগ খুঁজে পায়নি এবং এই মাসের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদনের প্রত্যাশা করছে।

এবার আসি কারা রয়েছেন এই টিকার সাফল্যের পেছনে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছেন বায়োএনটেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা উগুর সাহিন (৫৫) ও তাঁর স্ত্রী ও বোর্ডের সদস্য ওজলেম টুয়েরেসি (৫৩)। গতকাল ওই খবরে পুঁজিবাজারে বায়োএনটেকের শেয়ারের দাম ব্যাপক বেড়ে যায়। আর তাতেই জার্মানির শীর্ষ ১০০ ধনীর মধ্যে উঠে এসেছে এই দম্পতির নাম। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।

বিজ্ঞাপন
ছোটবেলা থেকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সাহিন। এটাই ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশেই মেডিসিন ও চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। শুরুতে হামবুর্গের একটি হাসপাতালে শিক্ষকতায় কাজ শুরু করেন।

উগুর সাহিন ও ওজলেম টুয়েরেসি

তুর্কি থেকে জার্মানিতে আসা এক অভিবাসীর সন্তান সাহিন। তাঁর বাবা জার্মানির কোলোনে গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি ফোর্ডের একটি কারখানায় কাজ করতেন। খুবই বিনয়ী স্বভাবের মানুষ সাহিন। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম এমআইজি এজি বোর্ডের সদস্য ম্যাথিয়াস ক্রোমায়ার সাহিনের সম্পর্কে বলেন, ‘এত সাফল্যের পরও খুবই নম্র স্বভাবের মানুষ সাহিন। সব মিটিংয়ে খুবই সাধারণ পোশাকে আসেন তিনি। সব সময় সঙ্গে থাকে তাঁর বাইসাইকেলের হেলমেট আর ব্যাক প্যাক।’ ফার্ম এমআইজি এজি ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বায়োএনটেককে সহায়তা দিয়ে আসছে।

ছোটবেলা থেকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সাহিন। এটাই ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশেই মেডিসিন ও চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। শুরুতে হামবুর্গের একটি হাসপাতালে শিক্ষকতায় কাজ শুরু করেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে সেখানেই টুয়েরেসির সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। চিকিৎসা গবেষণা এবং ক্যানসার বিজ্ঞান তাঁদের দুজনের আবেগের জায়গা হয়ে উঠে।

জার্মানিতে পাড়ি জমান এক তুর্কি চিকিৎসকের মেয়ে টুয়েরেসি। একবার সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এমনকি তাদের বিয়ের দিনও দুজন ল্যাবে কাজের জন্য সময় তৈরি করে নিয়েছিলেন।

এই দম্পতি শুরু থেকেই কাজ করেছেন ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়ে। যৌথ গবেষণায় তারা ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন ইমিউন সিস্টেম তৈরিতে সক্ষম হন। ২০০১ সালে উদ্যোক্তা হিসাবে জীবন শুরু হয় তাদের। ক্যানসার-বিরোধী অ্যান্টিবডি বিকাশের জন্য গ্যানিমেড ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন তারা। তবে সাহিন কখনই শিক্ষকতা পেশা বা একাডেমিক গবেষণা ছাড়েননি বা সেখান থেকে দূরে সরে যাননি। সে সময় তিনি মেইনজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক হিসেবে ছিলেন।

default-image

স্বামী স্ত্রীর স্বপ্নের দল

উগুর সাহিন ও ওজলেম টুয়েরেসির গবেষণা কার্যক্রমকে বলা যায় স্বামী-স্ত্রীর এক স্বপ্নের দল। করোনা মহামারির এই সময়ে সারা বিশ্বের মানুষের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছেন তারা।
এমআইজির ক্রোমায়ার বলেন, ‘টুয়েরেসি এবং সাহিনের জুটি একটি ‘ড্রিম টিম’। তারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মেলাতে পেরেছেন।’
আসলে বায়োএনটেকের এই টিকার গল্পটি মোড় নিয়েছিল যখন জানুয়ারিতে সাহিন চীনের উহান শহরে আবির্ভাব হওয়া নতুন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ওপর একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিয়ে তাদের কাছে আসেন। ক্যানসার বিরোধী এমআরএনএ ওষুধ থেকে এমআরএনএ ভিত্তিক ভাইরাল ভ্যাকসিন তৈরি কত ছোট পদক্ষেপ এ বিষয়টি বোঝান তিনি। বায়োএনটেক দ্রুত এই প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং গবেষণার জন্য ৫০০ সদস্যের একটি দল গঠন করে। মার্চে গবেষণার অংশীদার হিসেবে ফাইজার ও জিনের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি ফুসানকে পায় তারা।

মেইনজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংকোলজি অধ্যাপক ম্যাথিয়াস থিওবাল্ড ২০ বছর ধরে সাহিনের সঙ্গে কাজ করেছেন। সাহিন সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও বিনীত ব্যক্তি। তিনি এমন কাঠামো তৈরি করতে চান যা তাকে তার দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করতে দেয়।

এদিকে নতুন এই সাফল্য পাওয়ার পর রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাহিন বলেন, গবেষণায় ‘অসাধারণ সাফল্য’ প্রমাণিত হয়েছে। তবে কাজটি সামগ্রিকভাবে যে এতটা কঠিন হবে তা বছরের প্রথম দিকে তিনি বুঝতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0