default-image

২০২০ সালে বৈশ্বিক জিডিপি সংকোচন হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। কোটি কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আয় কমেছে তার চেয়েও অনেক বেশি মানুষের। স্বাভাবিকভাবেই গত বছর বিশ্বের অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতি কম ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ এক ব্লগপোস্টে লিখেছেন, গত বছর ৮৪ শতাংশ দেশে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ছিল।

এই বাস্তবতায় সুদহার স্বাভাবিকভাবেই কম ছিল। সরকারগুলোও প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে অর্থনীতি টেনে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। অর্থনীতিবিদেরা বরাবরই বলে আসছেন, এখন সবচেয়ে আরাধ্য কাজ হচ্ছে, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে মানুষের ভোগব্যয় বাড়ানো। এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ে চিন্তা করলে চলবে না। সম্প্রতি নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎস প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের এক নিবন্ধে বলেছেন, নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে যাঁরা মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করছেন, তাঁদের সেই ভীতি ভূতের ভয়ের মতো। প্রণোদনা সত্ত্বেও অনেক খাতেই মজুরি কমেছে। আর মূল্যস্ফীতি বাড়লেও তা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক হাতিয়ার আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সমর্থকেরা বলছেন, নতুন প্রণোদনা প্যাকেজে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তবে ডেমোক্র্যাটদের বক্তব্য হচ্ছে, অর্থনৈতিক ক্ষতি এত বেশি যে এই প্রণোদনাও যথেষ্ট নয়। ফলে মুদ্রাস্ফীতিজনিত মূল্যস্ফীতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীরাও এ নিয়ে বিশেষ উদ্বিগ্ন নন। তাঁরা মনে করছেন, নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতির যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা যথাযথ নয়।

বিজ্ঞাপন

চাহিদা বৃদ্ধি

সম্প্রতি বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধির দাবির সপক্ষে বলেছে, দেশে বর্তমানে যে মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, তা মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি—মুদ্রাস্ফীতিজনিত নয়। সে জন্য তারা সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছে। তবে তারা খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।

এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত, এখন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সম্মিলিত চাহিদার অভাব। তার মানে এই নয়, অভাব নামক প্রপঞ্চটির মৃত্যু ঘটেছে। মহামারির কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই নতুন দরিদ্র সৃষ্টি হয়েছে। আবার যাঁদের আয় কমেছে, যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, তাঁরা খরচের ব্যাপারে রক্ষণশীল হয়ে পড়েছেন। অনেক মানুষের জীবনে একধরনের অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ভোগব্যয় কমে যায়। তখন মানুষ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে বেশি আগ্রহী হয়।

অর্থনীতি এখন অনেকটা সচল হলেও প্রাক-মহামারি পর্যায়ে ফেরত যেতে আরও সময় লেগে যাবে। বিশেষ করে সেবা খাত পুরোপুরি চালু হতে সময় লেগে যাবে। এই শূন্যস্থান নিতান্ত তুচ্ছ নয়। দেশের অনেক বয়স্ক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ঘরের বাইরে যান না। তাঁদের বাড়িতে আগে যতজন সহকারী ছিলেন, এখন ততজন নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ—এসব কেন্দ্র করে যে মানুষেরা জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁরাও স্বাভাবিক জীবনে ফেরেননি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত প্রণোদনার ঋণ পাওয়ায় পিছিয়ে আছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তাদের শুধু ঋণ নয়, সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া দরকার। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও নতুন দারিদ্র্য মোকাবিলায় এই খাতের জন্য আরও প্রণোদনার প্রয়োজন আছে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। সরকার সে রকম পরিকল্পনাই করছে বলে জানা গেছে।

আগের নিয়ম খাটছে না

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুসারে, মজুরি বাড়লে এবং বেকারত্ব কমলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দেখা যায়, ২০০৯ সালে দেশটিতে বেকারত্বের হার ১০ শতাংশ থেকে ২০১৯ সালে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নেমে এলেও মূল্যস্ফীতি স্থির ছিল। এমনকি এ সময়ে মজুরিও বেড়েছে।

গীতা গোপীনাথ বলেছেন, অর্থনীতির কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণেও অর্থনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক ঠিক আগের মতো নেই। বিশ্বায়ন একটি কারণ—পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের প্রসারের কারণে মূল্যস্ফীতি একভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে। এমনকি ২০২০ সালের মহাদুর্যোগের সময় প্রথম দিকে সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা বিঘ্নিত হলেও বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খাত প্রাক-মহামারি পর্যায়ে ফিরে গেছে। তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো স্থবিরতার কবলে। ২০২১ সালে বিশ্বের ১৫০টি দেশের মাথাপিছু আয় ২০১৯ সালের তুলনায় কম হবে, এমনটাই প্রক্ষেপণ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দ্বিতীয়ত, অটোমেশন বা স্বতশ্চলীকরণ প্রক্রিয়ার কারণেও পণ্যের দাম বাড়ছে না বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন গীতা গোপীনাথ। এই প্রক্রিয়ার কারণে যেমন মূলধনি পণ্যের দাম কমেছে, তেমনি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের মজুরি বাড়লেও পণ্যের দামে প্রভাব পড়ছে না। কারণ, কিছু মানুষকে বেশি মজুরি দেওয়া হলেও অটোমেশনের কারণে আবার অনেক কম কর্মী নিয়ে কাজ সারা যাচ্ছে। মহামারির কারণে এই অটোমেশন প্রক্রিয়া আরও গতি পেয়েছে। এতে ব্যবসার প্রাথমিক খরচ বাড়বে ঠিক, কিন্তু অটোমেশনই তা আবার অনেক গুণ পুষিয়ে দেবে।

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা

দেশে দেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার আশপাশেই আছে। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ধারাবাহিকতার কারণে এটি সম্ভব হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতার কারণে সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পেলেও এমনটি ঘটবে না যে ঋণের সুদহার কম রাখার জন্য মূল্যস্ফীতি বাড়তে দেওয়া হবে। উদাহরণ হিসেবে জাপানের কথা বলা যায়, ২০০৯ সালের পর জাপানের সরকারি ঋণ জিডিপির দ্বিগুণ হলেও এই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। ব্যাপারটা হলো, মূল্যস্ফীতির হার বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বৃদ্ধি করে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ গ্রহণ কমে যায়। বিনিয়োগে প্রভাব পড়ে। কিন্তু এখন বাজারে মুদ্রাস্ফীতি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে সেটা করার প্রয়োজন পড়বে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মহামারির শুরু থেকেই অর্থনীতিবিদেরা মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধির পরামর্শ দিচ্ছেন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় তো বলেছেন, দরকার হলে নোট ছাপিয়ে গরিব মানুষের হাতে টাকা দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই আপাতত।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন