বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

করোনা মহামারি কাটিয়ে চীনের অর্থনীতিতে যে খরগোশের গতি দেখা গিয়েছিল, তা কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে। ভোক্তার আস্থা কমায় বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে দেশটির। চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (এনবিএস) তথ্য অনুযায়ী, জুনে শেষ হওয়া বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি এসেছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভারতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ১ শতাংশ। তাতে ভারতের সরকারি মহল বলতে শুরু করেছে, ভারত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এতে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, গত অর্থবছরের এপ্রিল-জুনে লকডাউনের ধাক্কায় জিডিপি ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। সে তুলনায় এ বছরের এপ্রিল-জুনে জিডিপি ২০ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ, এখনো তা কোভিডের আগের বছরের (২০১৯-২০ সালের এপ্রিল-জুন) স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। আবার ওই বছরও অর্থনীতির গতি শ্লথ ছিল।

এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিভিন্ন দেশ যে প্রবৃদ্ধির হিসাব দিচ্ছে, তা গত বছরের একই সময়ের সাপেক্ষে। সবাই জানে, গত বছর এই সময়ে সারা পৃথিবী লকডাউনে ছিল। ফলে সেবার এই প্রান্তিকে সবারই জিডিপি সংকুচিত হয়েছে। সেই সংকোচনের সাপেক্ষে এবার যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই ২০১৯ সালের সমপরিমাণ নয়। ফলে সব দেশই এখনো প্রাক্‌-কোভিড পর্যায় থেকে দূরে আছে।

এদিকে জুলাই মাসে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ১, যদিও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তাদের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮। কোভিডের সঙ্গে আছে ব্রেক্সিটের প্রভাব। ফলে খুব শিগগির তাদের প্রাক্‌-কোভিড পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির হারও ছিল ৪ দশমিক ৮। দেশটিতে এখন চলছে করোনাভাইরাসের ডেলটা ভেরিয়েন্টের তাণ্ডব।

এদিকে প্রযুক্তি কোম্পানি মাইক্রোসফট আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কার্যালয় পুরোপুরি চালু করার যে পরিকল্পনা করেছিল, তা থেকে সরে এসেছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কর্মীদের কার্যালয়ে নিয়ে আসার যে পরিকল্পনা করছিল, সেখান থেকেও সরে এসেছে। আমাজন ও ফেসবুক ইতিমধ্যে জানিয়েছে, ২০২২ সালের আগে কর্মীদের কার্যালয়ে নিয়ে আসছে না তারা। অর্থাৎ, ডেলটা ভেরিয়েন্টের তাণ্ডবের কারণে সবার মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

বৈশ্বিক প্রবণতা হলো, যেসব দেশে বেশি সংখ্যক মানুষ টিকা পেয়েছেন, সেই সব দেশ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে আছে। অনেক দেশ এখনো টিকাপ্রাপ্তিতে পিছিয়ে আছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ টিকার মজুত আছে। যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যাচ্ছে, যেসব রাজ্য টিকাদানে পিছিয়ে আছে, সেই সব রাজ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। যেমন আরকানসাস। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ডেলটা ভেরিয়েন্টের তাণ্ডব চলছে। এই অঞ্চলের ইন্দোনেশিয়া বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র। ফলে গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা থাকলেও সরবরাহের ঘাটতি আছে। এতে বেড়ে গেছে গাড়ির দাম।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি না হলেও বলা যায়, ডেলটা ভেরিয়েন্ট মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করছে। এদিকে কয়েক সপ্তাহ আগে চীন তাদের বড় এক বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বন্ধ করে দিয়েছে। ডকের এক শ্রমিক ডেলটা ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সামনেই বড় দিন। এই সময় বিশ্বের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হবে। তাতে ইতিমধ্যে জাহাজভাড়া ৩৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

বোঝা যাচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি এখনই স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত যাচ্ছে না। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আছে। তবে সবার আগে দরকার হলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ। মানুষের মনে আস্থা ফিরে না এলে অর্থনীতি স্বাভাবিক হবে না বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। এ ছাড়া সরবরাহব্যবস্থাও স্বাভাবিক হবে না।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন