default-image

গত বছর ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অন্যদিকে বিদায়ী ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসও এ দৌড়ে পিছিয়ে থাকেনি। এই দলটিও চাঁদা নিয়েছে।
যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে রাজনৈতিক দলগুলো, তাদের তালিকা ভারতীয় নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। সেই তালিকা ধরে ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এই প্রতিবেদনটি করেছে। বিজেপি ও কংগ্রেস—উভয় দলকে সবচেয়ে বেশি চাঁদা দিয়েছে ভারতী গ্রুপের নেতৃত্বাধীন সত্য ইলেকটোরাল ট্রাস্ট। দুই দলকে এই ট্রাস্টটি মোট ৭৮ কোটি রুপি দিয়েছে।
বিজেপি: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর খবরে বলা হয়েছে, নির্বাচনী খরচ চালানোর জন্য বিজেপি ৩৬৩ কোটি রুপির তহবিল সংগ্রহ করেছিল। মোট চাঁদার এক-তৃতীয়াংশই এসেছে এক কোটি রুপির বেশি চাঁদা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। বিজেপিতে সবচেয়ে বেশি ৪১ কোটি ৩৭ লাখ রুপি দিয়েছে সত্য ইলেকটোরাল ট্রাস্ট। সত্য ইলেকটোরাল ট্রাস্টের সবচেয়ে বেশি অংশের মালিক ভারতী গ্রুপ। অন্য অংশীদারেরা হলো ডিএলএফ, হিরো মোটরস, জুবিলেন্ট, ইন্ডিগো, কে কে বিরলা ও শ্রীরাম গ্রুপ।
এ ছাড়া বেদান্ত গ্রুপ সাড়ে ২২ কোটি, স্টারলিট ইন্ডাস্ট্রিজ ১৫ কোটি, কেয়ার্ন ইন্ডিয়া সাড়ে ৭ কোটি, লুধা ডুয়েলার্স ৫ কোটি ৪৫ লাখ, টরেন্ট ফার্মা ৪ কোটি ও ক্রম্পটন গ্রেভস সাড়ে ৩ কোটি রুপি চাঁদা দিয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছর জুড়ে এই বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করে বিজেপি। এ ছাড়া বিজেপিকে এক কোটি রুপি করে চাঁদা দেওয়ার তালিকায় রয়েছে মাহিন্দ্রা লাইফ স্পেস, হিরো সাইকেল, ভারত ফোর্জ, টরেন্ট পাওয়ার, ক্যাডিলা হেলথকেয়ার, ভিডিওকন, বিরলা করপোরেশন ও সিরাম ইনস্টিটিউট।
বিজেপির দেওয়া তালিকায় দেখা গেছে, কমপক্ষে ২০ হাজার রুপির বেশি অর্থ চাঁদা দিয়েছেন এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৪৮০। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় বড় দাতাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিজেপি ১২০ কোটি রুপি নিয়েছে। আর বড় প্রতিষ্ঠানের কাছ কংগ্রেস নিয়েছে ৫০ কোটি রুপি।
কংগ্রেস: চাঁদা তোলায় সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসও পিছিয়ে ছিল না। নির্বাচনী খরচ চালানোর জন্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এই দলটি সংগ্রহ করেছিল ৫৯ কোটি রুপি। এর ৮০ শতাংশই দিয়েছে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। কংগ্রেসকে কমপক্ষে ২০ হাজার রুপি চাঁদা দিয়েছে এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭১০।
বিরোধী দল কংগ্রেসকে কমপক্ষে এক কোটি রুপি চাঁদা দিয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০। সবচেয়ে বড় অঙ্কের চাঁদা দিয়েছে ভারতী গ্রুপের অধীন সত্য ইলেকটোরাল ট্রাস্ট—৩৬ কোটি ৫০ লাখ রুপি, এভি পাতিল ফাউন্ডেশন ৫ কোটি রুপি ও ভারত ফোর্জ দিয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ রুপি।
ভারতের বর্তমান কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একটি কোম্পানি তাদের মোট লভ্যাংশের সাড়ে ৭ শতাংশ রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুদান হিসেবে দিতে পারে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ভারতের কেন্দ্রীয় কর কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুদান দেওয়ার জন্য ট্রাস্ট গঠনের বাধ্যবাধকতা জারি করেছে। এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির বড় বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ট্রাস্ট গঠন করেছে।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকুক—ভারতের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর চাঁদা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপিই প্রথম পছন্দ। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকারের শাসনকালেও বিজেপিই সবচেয়ে বেশি চাঁদা পেয়েছে ভারতের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে।
ভারতের বেসরকারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন নিয়ে কাজ করা অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক রিফর্মের প্রতিষ্ঠাতা (এডিআর) এস ছোকার বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘কে কাকে কত চাঁদা নিল বা দিল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দল উভয় পক্ষকেই দেওয়া-নেওয়ার হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।’
এডিআরের করা এই হিসাবে দেখানো হয়েছে, অর্থবছর ২০০৫ থেকে ২০১২—আট বছরে কংগ্রেস থেকে বিজেপি ২০ কোটি রুপি বেশি চাঁদা পেয়েছে। উৎপাদন ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পছন্দের শীর্ষে আছে বিজেপি। এ ধরনের কোম্পানিগুলো বিজেপিকে দিয়েছে ৯৩ কোটি রুপি। অন্যদিকে খনিজ সম্পদ, আবাসন ও বিভিন্ন ট্রাস্টের পছন্দের তালিকায় রয়েছে কংগ্রেস। তারা কংগ্রেসকে দিয়েছে ৯২ কোটি রুপি। সব মিলিয়ে উৎপাদন ও আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে বড় দাতা হিসেবে উঠে এসেছে এডিআরের গবেষণায়।
কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের প্রথম সাত বছরে প্রধান দাতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে আদিত্য বিরলা গ্রুপের জেনারেল ইলেকটোরাল ট্রাস্ট ৩৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি, টরেন্ট পাওয়ার ১১ কোটি ৮৫ লাখ রুপি, ভারতী গ্রুপের ভারতী ইলেকটোরাল ট্রাস্ট দিয়েছে ১১ কোটি রুপি। একই সময় বিজেপির তিন শীর্ষ দাতাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে জেনারেল ইলেকটোরাল ট্রাস্ট ২৬ কোটি ৫৭ লাখ রুপি, টরেন্ট পাওয়ার ১৩ কোটি রুপি, এশিয়ানেট ভি হোল্ডিং ১০ কোটি রুপি।
২০১৩ অর্থবছরে কংগ্রেস চাঁদা হিসেবে পেয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ রুপি। একই সময়ে বিজেপি পেয়েছে প্রায় ৮০ কোটি রুপি। শুরুর দিকে আদিত্য বিরলা গ্রুপ বড় দাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেও পরে তারা কংগ্রেসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন