ইউক্রেনে রুশ হামলার প্রভাব
ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইউক্রেনে রাশিয়া হামলা করতে না করতেই বিশ্ববাজারে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
ইউক্রেনে রুশ হামলার তাৎক্ষণিক প্রভাবে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। তা জেনেই দেশের বাজারেও ব্যবসায়ীরা আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যগুলোর দাম বাড়াতে শুরু করেছেন। দেশে চাল ছাড়া খাদ্যশস্যসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের বড় অংশই আমদানিনির্ভর।
রাশিয়ার হামলার প্রথম দিনে গতকাল বৃহস্পতিবারই আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন, পাম, গমসহ নিত্যপণ্যের দাম টনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ ডলার বেড়েছে। দেশের বাজারেও এসব পণ্যের
দাম কেজিতে এক থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে দাম বাড়লেও কেনাবেচা হয়েছে কম। কারণ, অনেক ব্যবসায়ীই বৈশ্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানান।
আগামী এপ্রিল মাসে পবিত্র রমজান শুরু হচ্ছে। এ উপলক্ষে জানুয়ারি থেকেই পণ্য আমদানি শুরু হয়েছে। রোজায় বেশি ভোগ করা হয়, এমন পণ্যগুলোর আমদানি অবশ্য স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বৈশ্বিক সংকটের কারণে সামনে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশে মূলত গম, মটর ডাল ও সরিষা দানা আমদানি হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার ইউক্রেনে রুশ হামলার পর জাহাজীকরণের অপেক্ষায় থাকা পণ্য আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দেশে তেল–চিনি–গম ও ডালের দাম বাড়ল
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাবে দেশের বাজারে সপ্তাহখানেক ধরেই ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছিল। গতকাল ইউক্রেনে রুশ হামলার পরপরই চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে বিভিন্ন পণ্যের দাম।
ব্যবসায়ীরা জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি গমের দাম এক টাকার বেশি বেড়েছে। ফলে কানাডার গম এখন প্রতি মণ ১ হাজার ৭০০ টাকায় উঠেছে। সয়াবিনের দাম কেজিতে বেড়েছে চার টাকা। তাতে প্রতি মণ সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৩০০ টাকায়। একইভাবে কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে প্রতি মণ পাম তেলের দাম উঠেছে ৫ হাজার ৮০০ টাকায়। এ ছাড়া প্রতি কেজি চিনির দাম ২ টাকা বেড়ে ৭৫ টাকায় এবং মটর ডালও ২ টাকা বেড়ে ৪৩ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী শাহেদ উল আলম
প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশে। এ মুহূর্তে সরবরাহটা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্ববাজারে লাগামছাড়া দাম
রাশিয়া–ইউক্রেন সংকটের কারণে এমনিতেই বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছিল। গতকাল হামলার পর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে ভোগ্যপণ্য থেকে শিল্পের কাঁচামাল—সব পণ্যের দাম বাড়ে। আবার জাহাজ ভাড়াও বেড়ে যায়।
জানতে চাইলে বাজার বিশ্লেষক আসির হক সিঙ্গাপুর থেকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়া–ইউক্রেন সংকটের অনিশ্চয়তায় বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে। যেমন বুধবার প্রতি টন পাম তেলের দাম ছিল ১ হাজার ৬৬৫ ডলার (চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত পৌঁছানোর খরচসহ)। বৃহস্পতিবার তা শুরুই হয় ১ হাজার ৭০০ ডলার থেকে, যা দিন শেষে ৭০ ডলার বেড়ে ১ হাজার ৭৭০ ডলারে ওঠে। এমন চিত্র সয়াবিন, গমসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের গমের দাম কিছুটা কমতির দিকে ছিল। কিন্তু হামলার পর সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশের ওপর চাপ পড়বে। গতকালই কানাডার উচ্চ প্রোটিনযুক্ত গমের দাম টনপ্রতি ৫০ ডলার বেড়ে ৫০০ ডলারে উন্নীত হয়েছে।
জানুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ ভালো
দেশে ভোগপণ্যের বড় অংশ আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২১–২২ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) এ বন্দর দিয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানি স্বাভাবিক ছিল। এ সময়ে আগের ২০২০–২১ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মটর ডাল আমদানি ১৩ হাজার টন বেড়ে তিন লাখ টনে, ছোলা আমদানি ১০ হাজার টন বেড়ে ১ লাখ ৪২ হাজার টনে এবং সয়াবিন তেলের কাঁচামাল সয়াবীজের আমদানি ৯৭ হাজার টন বেড়ে ১১ লাখ ৬২ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। সয়াবিন আমদানিও সামান্য বেড়েছে। অবশ্য মসুর ডালের আমদানি ৩০ হাজার টন কমে ১ লাখ ৭৮ হাজার টনে নেমেছে।
সামনে শঙ্কা
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গম আমদানি হয় কানাডা থেকে। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে মোট আমদানির ২৮ শতাংশ বা ১৯ লাখ ৮২ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে সেই দেশ থেকে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। দেশ দুটি থেকে গত অর্থবছর ২৫ লাখ ৮০ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে।
রাশিয়ার হামলার কারণে ইউক্রেন তাদের বন্দরগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করেছে। ফলে ইউক্রেন থেকে দেশে গমসহ যেসব খাদ্যশস্য জাহাজীকরণের অপেক্ষায় ছিল, সেগুলো আপাতত আসছে না। সংকটের আগে বাংলাদেশে কত চালান জাহাজীকরণের অপেক্ষায়, ছিল তা জানা যায়নি।
ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাশিয়া–ইউক্রেন সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই ভোগ্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়েছে। কারণ, বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের ৩০–৩৫ শতাংশ সরবরাহ আসে রাশিয়া–ইউক্রেন থেকে।’
রাশিয়া থেকে মটর ডালের একটি চালান জাহাজীকরণের অপেক্ষায় থাকার কথা উল্লেখ করে আবুল বশর চৌধুরী বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রপ্তানিকারক আমাদের চালানটি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন।’