বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুসারে, চলতি বছর ভোগ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ—২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। কিন্তু সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশের মূল্যস্ফীতির হার আরও বেশি থাকবে—৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও তুরস্কের মতো দেশ বিপাকে পড়বে বলে মনে করছে দ্য ইকোনমিস্ট। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের কথাও যুক্ত করা যায়। সর্বশেষ বিধিনিষেধের পর পরিবহনভাড়া ছিল বাড়তি। তার সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। তাতে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।

সংকটের আরেকটি কারণ হলো, এবারের কোভিড সংকটে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুনরুদ্ধারের বেলায়ও তারা পিছিয়ে আছে। এই মুহূর্তে বাড়তি মূল্যস্ফীতি মানুষের চাহিদায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পিছিয়ে যাবে বলেই শঙ্কা।

অর্থনীতির ইতিহাসে দেখা যায়, উদীয়মান দেশের মূল্যস্ফীতি উন্নত দেশের তুলনায় এমনিতেই অস্থিতিশীল। তবে ১৯৭০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের মূল্যস্ফীতি উন্নত দেশের মতো অনেকটাই স্থিতিশীল হয়। ১৯৯৫ সালে যেখানে উদীয়মান দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে ২০০৫ সালে তা নেমে আসে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে। এরপর ২০১৫ সালে তা আরও নেমে আসে ২ দশমিক ৭ শতাংশে। আইএমএফ যে বলছে, এ বছর ভোক্তা মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, তা কিন্তু সাম্প্রতিক প্রবণতা থেকে খুব একটা দূরে নয়। আবার অনেক উন্নয়নশীল দেশের মূল্যস্ফীতির হার এর চেয়ে অনেক বেশি—ব্রাজিলে ১০ দশমিক ২ শতাংশ, তুরস্কে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ ও আর্জেন্টিনায় ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ।

তবে মূল্যস্ফীতির এই উচ্চ হার নিছক খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যস্ফীতিজনিত নয়। অনেক উন্নত ও উদীয়মান দেশে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতি বাড়লেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তৎপর হয়ে ওঠে। তখন তারা অর্থের প্রবাহ কমানোর উদ্যোগ নেয়। আর মানুষও মনে করে, এই পরিস্থিতিতে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে যাবে, তাতে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদি হবে না।

কিন্তু এই আপাত-সুখকর চিত্র নানা কারণে বিনষ্ট হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা হলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এ ব্যাপারে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রসঙ্গ আনা যায়, যিনি নিজেকে সুদ আয়ের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেন। এমনকি তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দিয়ে আদর্শ সুদহার কমানোরও উদ্যোগ নেন। তাঁর দাবি, এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। গত কয়েক মাসে তিনি বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন। এতে উল্টো ফল হয়েছে, দেশটি থেকে অনেক টাকা বেরিয়ে গেছে এবং মুদ্রার মান আরও কমে গেছে। গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি আরও ৮ শতাংশ বেড়েছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার চার গুণ।

গোল্ডম্যান স্যাকস বলছে, আগামী বছরজুড়ে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকবে। সহজভাবে বললে, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য যত দিন না আসছে, তত দিন এই সমস্যা থাকবে। এই পরিস্থিতি যেমন ব্যক্তিশ্রেণির ভোক্তার জন্য ক্ষতিকর, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও ক্ষতিকর। বাড়তি মূল্যস্ফীতির কারণে চাহিদা পড়ে যাবে। এতে বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়বে না।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি

মানুষ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির একটি বিচিত্র বিপদ আছে। সেটা হলো, খাদ্য মূল্যস্ফীতি চরিত্রগতভাবে দীর্ঘমেয়াদি হয় না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ব্যাপক ওঠানামা করে। স্বভাবতই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো শুধু খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সচরাচর আর্থিক নীতি পাল্টায় না এবং এই না পাল্টানোর ন্যায্য কারণ আছে। সমস্যা হলো, যত ক্ষণস্থায়ী হোক না কেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি যত দিন থাকে, তত দিন তার আঁচ সরাসরি ক্রেতাদের ওপর পড়ে। আর এবার খাদ্য মূল্যস্ফীতি একেবারে ক্ষণস্থায়ী হচ্ছে না। সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে অনেকে মনে করেন।

খাবারের মধ্যে সাধারণত প্রোটিনযুক্ত খাবারের দাম বেশি, সেই তুলনায় কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের দাম অনেক কম। ফলে, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হলে মানুষ স্বভাবতই কম দামি খাদ্যপণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে। খাদ্যাভ্যাসে প্রোটিন, ভিটামিন ও বিবিধ পুষ্টিগুণসম্পন্ন অণু খাদ্যের মাত্রা কমলে পরিবারের সদস্যদের ওপর তার প্রভাব পড়ে। পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। সুষম আহার না মিললে শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, তাদের মানসিক বিকাশ যথাযথ হতে পারে না। কর্মক্ষমতায় ঘাটতি থেকে যায়। রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও ঠিকভাবে গড়ে ওঠে না।

খাদ্য ঘাটতির এই অভিঘাত আবার লিঙ্গনিরপেক্ষ নয়—পুরুষের তুলনায় নারীর ওপর এই অপুষ্টির প্রভাব বেশি। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে যে বৈষম্য পুরুষতান্ত্রিক পরিবারব্যবস্থায় ‘স্বাভাবিক’, সেখানে ছেলেদের পাতে যদিও-বা কিছু উচ্চ গুণমানের খাবার পড়ে, মেয়েদের সেটুকুও জোটে না। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে এই বঞ্চনা অন্য সমস্যা সৃষ্টি করে—পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব হলে প্রসবের সময় তাঁদের জীবন সংশয়ে পড়তে পারে, অপুষ্ট শিশু জন্মগ্রহণ করে—পরিণামে শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে যায়।

পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিজনিত পুষ্টির ঘাটতির সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। এই ঘাটতি মানুষের সক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। ফলে এই ঘাটতি দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক অসাম্য আরও গভীর করে তোলে। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে ভুক্তভোগী হয় দরিদ্র মানুষেরা। সেই সঙ্গে অন্যান্য শ্রেণির মানুষেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন