default-image

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদেরাও বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসির পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির (পিএসি) কাছ থেকে চাঁদা নিতেন। কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে এইচএসবিসির আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়ার কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন রাজনীতিবিদদের অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দেয় পিএসি।
এইচএসবিসির আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা উদ্ঘাটনকারী সেন্টার ফর পাবলিক ইন্টেগ্রিটির (সিপিআই) আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক কনসোর্টিয়াম (আইসিআইজে) মার্কিন নেতাদের ডোনেশন বা চাঁদা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, এইচএসবিসি উত্তর আমেরিকা পিএসির কাছ থেকে অনুদান বা চাঁদা নেওয়া মার্কিন নেতাদের মধ্যে ডাকসাইটে ব্যক্তিরাও আছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান পার্টির দলনেতা মিচ ম্যাকোনেল ও নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান পার্টির দলনেতা কেভিন ম্যাকার্থি। তালিকায় আরও আছেন নিউইয়র্কের গভর্নর ও ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা অ্যান্ড্রু কুয়োমো, সিনেটর কুরি অ্যান্থনি বুকার, প্যাট টোমি ও প্যাট রবার্টস এবং প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জেমস ক্লাইবার্ন, পল রায়ান, পিটার থমাস কিং ও ড্যারেল ইসা।
এইচএসবিসি পিএসির কাছ থেকে মাত্র এক হাজার মার্কিন ডলারের মতো নগণ্য অর্থও নিয়েছেন নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেমব্লির সাবেক স্পিকার শেলডন সিলভার। গত বছরের সেপ্টেম্বর পুনর্নির্বাচনের সময়ে তিনি এই অর্থ নেন। ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি গত বৃহস্পতিবার তাঁকে প্রতারক ও চাঁদাবাজ হিসেবে অভিযুক্ত করেছে।
এইচএসবিসি দেশে দেশে গ্রাহকদের কর ফাঁকি দিয়ে অর্থ পাচারে সহায়তা করেছে—এমন চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশিত হয় ৯ ফেব্রুয়ারি। বিশ্বের ২০৩টি দেশের ১ লাখ ৬ হাজার ব্যাংক হিসাবের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ ধরনের একটি দেশভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করে সিপিআইয়ের আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক কনসোর্টিয়াম (আইসিআইজে)। বিভিন্ন দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ হিসাব করে এ তালিকা করা হয়েছে। ফরাসি পত্রিকা লা মঁদ, ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি, গার্ডিয়ানসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম আইসিআইজের সঙ্গে এ অনুসন্ধান চালায়। এতে বেরিয়ে আসে ১১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার পাচারের তথ্য। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের ১৬ গ্রাহকের ৩১টি হিসাবে ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার পাচার হয়েছে।
উত্তর আমেরিকায় এইচএসবিসি প্রায় প্রতিমাসেই রাজনৈতিক চাঁদা বা অনুদান দিয়ে থাকে। ২০১৪ সালে ব্যাংকটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ও রাজ্য নেতাদের আড়াই লাখ ডলারের বেশি অর্থ দেয়। ফেডারেল ইলেকশন কমিশনকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এইচএসবিসির উত্তর আমেরিকা পিএসির হাতে গত মাসের (জানুয়ারি) শেষ নাগাদ ৭ লাখ ৭৬ হাজার ডলার নগদ অর্থ ছিল।
নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতাদের অনুদান দেওয়া ছাড়াও এইচএসবিসি ওয়াশিংটন ডিসিতে লবি করার কাজেও বিগত এক দশক ধরে বছরে ২০ থেকে ৪০ লাখ ডলার খরচ করেছে। আইনপ্রণেতা ও সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য এ অর্থ খরচ করে প্রতিষ্ঠানটি। এটি কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদকে দেওয়া তথ্য।
২০১৪ সালে এইচএসবিসি লবিং করার জন্য ১১ জন রেজিস্টার্ড লবিস্ট নিয়োগ করে। সেন্টার ফর রেসপন্সিভ পলিটিকসের তথ্য অনুযায়ী এঁদের মধ্যে ১০ জনই অতীতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারে কাজ করেছিলেন।
এইচএসবিসির আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে বিশ্বব্যাপী খবর প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে দেশে এ ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সুইস সরকার ফৌজদারি তদন্ত চালানোর উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে মানি লন্ডারিং বা অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ খুঁজতে ব্যাংকটির জেনেভা কার্যালয়ে পুলিশি তল্লাশি চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আইনপ্রণেতাও এইচএসবিসির আার্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন।
গ্রাহকদের কর ফাঁকি দিয়ে অর্থ পাচারে সহায়তা করার ঘটনায় এইচএসবিসি ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন পত্রিকার পুরো পাতাজুড়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্ষমা চেয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেপিমর্গ্যানচেজ, বিপি, গোল্ডম্যান স্যাচ ও নিউজ করপোরেশনের মতো বড় অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) রাজনৈতিক নেতাদের অনুদান বা চাঁদা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। তবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তা আবার চালু করে।

বিজ্ঞাপন
বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন