বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একজন কর্মীকে প্রতিষ্ঠান থেকে নির্ধারিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতার মিশেলে গড়ে তুলা হয়। তাই কর্মীরা একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। কিন্তু ব্যাংকারদের অনেক সময় যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই ডেস্কে বসানো হয়। তারপরও একজন ব্যাংকার মনেপ্রাণে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার মনোভাব পোষণ করেন। কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকিং সেবায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একনিষ্ঠভাবে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত থাকেন। হোক সেটা নিচু স্তরের কর্মী কিংবা ওপরের স্তরে যে কেউ। সে জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবার মান সমুন্নত বজায় আছে। অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এখানেই ব্যাংকের আলাদা স্বকীয়তা!

default-image

২০২০ সালের প্রথম দিক থেকে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবে পুরো বিশ্ব শঙ্কিত ছিল। মহামারির কারণে ব্যবসায়ে মন্দাভাব দেখা দেয়। এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যাংকিং দুনিয়ায় অব্যাহত থাকে। সে সময়েও ব্যাংকাররা ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংকিং সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। বস্তুত, করোনাকালে ব্যাংকিং সেবার ব্যাপ্তি অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক কঠিন ছিল। তা সত্ত্বেও উল্লেখ করার মতো ফরেন রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আমাদের দেশে এসেছে। বলতে গেলে করোনার কঠিন সময়ে ব্যাংকাররা সম্মুখসারির কর্মী হিসেবে নিবেদিত ছিলেন। করোনায় আক্রান্ত রোগী যে ব্যাংকে সেবা নিতে আসেননি, তা বলা মুশকিল। তা না হলে কি আর কোনো একজন করোনা রোগী ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে ব্যবস্থাপকের কক্ষে যেয়ে বলেন, ‘স্যার, খাস দিলে দোয়া কইরেন! এভাবেই ব্যাংকাররা নীরবে সেবা দিয়ে দুঃসময়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন।’

যা–ই হোক, আমানতের লক্ষ্যমাত্রা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমানতের লক্ষ্যমাত্রাকে ঘিরে ব্যাংকে অনেকের চাকরি এখন নড়বড়ে অবস্থানে আছে। সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত কোনো অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও কোভিডকালীন শুধু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করা বা অদক্ষতার অজুহাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং চাকরি থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পদত্যাগ করার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাপরটা যেমন আমাদের জন্য সুখকর নয়, তেমনি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনাপ্রসূত নয়। যাঁরা কঠিন সময়ে করোনার ঝুঁকি মোকাবিলা করে দেশের সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদান করেছেন, তাঁদের চাকরিচ্যুত করা অপ্রত্যাশিত।

default-image

চারদিকে যখন করোনার অশনিসংকেত, দুঃসময়ের থাবা, বিধিনিষেধে দেশ অচল, ব্যবসার কোনো পরিস্থিতি নেই, সে সময় ব্যাংকিং খাতেও দুঃসময় বিরাজ করেছে। অথচ করোনার কারণে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করে তা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে সেবা দিতে গিয়ে অনেকেই কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন, যাঁদের অনেকেই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেছেন। তারপরও ব্যাংকাররা নিজ নিজ অধিক্ষেত্র থেকে যথাসাধ্য চেষ্টার পরও অনেকে লক্ষমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এত দিন প্রতিষ্ঠানকে ভালো কিছু দিতে পারলেও করোনার কারণে হয়তো সেটা সম্ভব হয়ে উঠেনি, তাতেই চাকরিচ্যুত। তাঁদের এত দিনের শ্রম সবই বিফলে গেল! অথচ প্রতিদিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্রমে গড়া প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তাঁদের অসামান্য অবদান রয়েছে। কিন্তু আজ তাঁদের প্রতিষ্ঠানটির বোঝাস্বরূপ বিবেচনা করা হচ্ছে। কয়েক দিনেই তাঁদের শ্রম নিঃশেষ হয়ে গেল। বর্তমানে তাঁদের করোনাকালের চেয়েও শঙ্কিত সময় পাড়ি দিতে হচ্ছে। অথচ জীবনের ছোট ছোট প্রত্যাশা তাঁদের মধ্যেও উঁকি দিত। চাকরি চলে যাওয়ার কারণে জীবনসংগ্রাম যেন তাঁদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ফলে শুধু চাকরিচ্যুত কর্মীর ওপর প্রভাব ফেলবে না, বরং তাঁদের সঙ্গে জড়িত পুরো পরিবারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকবে। এমনিতে করোনাকালে সরকারি-বেসরকারিসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে নিয়োগ প্রায় বন্ধ ছিল। এই কঠিনতম সময়ে তাঁদের চাকরিচ্যুত করা মানে দেশের বেকারত্বের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেওয়া। এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থার ওপর বিদ্যমান থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে একটি পরিপত্র জারি করেছে। এতে বলা হয়, ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত কোনো অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও চাকরিচ্যুত হয়েছেন কিংবা চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের (আবেদনপ্রাপ্তি সাপেক্ষে) বিধি অনুযায়ী চাকরিতে বহাল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এ সময় চাকরির বাজারে সবাই চাকরির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা চান। চাকরিক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে এবং পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং চাকরিতে গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা কমে আসবে, যা ভবিষ্যৎ চাকরিক্ষেত্রে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন একটি উদ্যোগ প্রশংসনীয়, যা চাকরিচ্যুত কর্মীদের মনে নতুনভাবে আশা জাগাবে। আশা করি, এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ভবিষ্যতে না ঘটার সম্ভাবনা থাকবে এবং সবাই চাকরিক্ষেত্রে নিরাপদ চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে পূর্ণোদ্যমে কাজ করতে পারবেন।

খবর থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন