ধারাবাহিক রচনা: কৃষ্ণকলি-দুই

অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা মাউথ অর্গানের সুর বেশ মন দিয়েই শুনছিল কৃষ্ণা। এ দেশে পিয়ানো আর বেহালা বেশ জনপ্রিয়। তবে কৃষ্ণার প্রিয় প্রতি শনি–রোববার পাশের বাড়ির এই মন কেমন–করা সুর।

এই বংশীবাদক কৃষ্ণার অচেনা কেউ নয়। এই ভিনদেশ, ভিন্ন ভাষার সমুদ্রপাড়ে কৃষ্ণা যখন কূল খুঁজে পাচ্ছিল না, তখন তাকে পথ দেখিয়েছিল হামিদ। হামিদুর রহমান।

হামিদের জন্ম আমেরিকায়। তাই সে জন্মসূত্রেই মার্কিন। তবে হামিদ কৃষ্ণার মতোই মনেপ্রাণে বাঙালি। এ দেশের কয়েক মণ মাখন দেওয়া কেক নয়, হামিদকে জন্মদিনে তার মা গুড়ের সন্দেশ আর পায়েস বানিয়ে দেন। হামিদ বলে, অত মাখন খেয়ে কে রোগবালাই বানায়? আমার পায়েসই ভালো।

হামিদের মা তানিশা রহমান আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে এ দেশে এসেছিলেন ছাত্রী হয়ে। দুচোখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে। পারিবারিকভাবেই বিয়ে করেছিলেন বাবার বন্ধুর ছেলে মারুফ–উর–রহমানকে। একমাত্র ছেলের জন্মের পর মারুফ ছেলের মুখ দেখে নাম রেখেছিলেন হামিদ। বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে।

শামসের মতোই হাসিখুশি পরিবার ছিল মারুফ-তানিশার। তবে আমেরিকায় এসে যেকোনো কারণেই হোক, মারুফ ঠিক অত ভালো চাকরি পাননি। তবে ভালো গাড়ি চালাতে পারতেন বলে উবার/লিফটে গাড়ি চালাতেন। নিজের কাজ নিয়ে বেশ খুশি ছিলেন মারুফ। স্ত্রীকে বলতেন, এই ভালো। নিজের ইচ্ছায় নিজের উপার্জন।

কিন্তু বিধি বাম! তিন বছর আগে একদিন রাতে উবার চালাতে গিয়ে এক মাতাল ড্রাইভারের নেশার বলি হলেন মারুফ। পেছনের গাড়িচালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোরে আঘাত হানে মারুফের গাড়িতে। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে পুলিশ মারুফকে যখন উদ্ধার করে, ততক্ষণে তিনি না–ফেরার দেশে। তাই হামিদের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেও ছেলেকে বেশি দূর গাড়ি চালাতে দিতে নারাজ মা তানিশা।

বিভোর হয়ে হামিদের বাজনা শুনছিল কৃষ্ণা। সে নিজেও কি–বোর্ডে সুর তোলে মাঝেমধ্যে। আর এখন হামিদ যে দেশাত্মবোধক গানের সুরে বুঁদ ছিল, সেই একই সুর কৃষ্ণা নিজেও বাজায় তার যন্ত্রে। কী মনে হলো কৃষ্ণার কে জানে। হামিদের সঙ্গে সে বাজানো শুরু করল একই গান।

চমকে উঠলেন লাইলি-শামস। বাহ, বেশ লাগছে তো!

‘বাজা, মামণি...।’ শামস উৎসাহ জোগান মেয়েকে। তবে বেরসিক ক্রিং ক্রিং বাদ সাধল সংগীতচর্চায়।

‘আরে ধুর ফোন...।’ বিরক্তি ঝেড়ে দিলেন লাইলি।

ফোনের ওপাশে বাংলাদেশ আর সঙ্গে অতিপরিচিত একটা নাম দেখে গান মাথায় উঠল কৃষ্ণার। ‘হ্যালো, শিপ, কেমন আছ?’

ডা. সিরাজ সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করেন এই কণ্ঠস্বরটা শোনার জন্য। অপেক্ষা করেন সিরাজের স্ত্রী কাজলও। আর সিরাজের আট বছরের ছেলে শুভর কাছে কৃষ্ণা পু মানেই সব মুশকিল আসান।

‘আরে ধুর, তোর ভাই ভালো থাকতে তো দিল না রে মা...।’ সিরাজের কণ্ঠে কৃত্রিম কান্নার আভাস।

‘এই, খবরদার, শুভকে কেউ কিচ্ছু বলেছ তো মরেছ!’

বোনের গলায় আদরের আভাস পেয়ে শুভ শুরু করল ফোঁপানো। ‘দেখ না কৃষ্ণা পু, আব্বু খালি বকে!’

কাজল সাবধান করলেন, ‘এই কৃষ্ণা, লাই দিস নারে! আদর পেয়ে বাঁদর মাথায় চড়েছে একেবারে!’

সিরাজের ছেলে শুভ। আর শরিফের সমৃদ্ধ। দুজনই কৃষ্ণার চোখের মণি। এদের কান্না কৃষ্ণা মোটেই সহ্য করতে পারে না।

অন্যদিকে চাচা–চাচির সঙ্গে কোনো রকম বেয়াদবিও করা যাবে না যে! কৃষ্ণা কাজলকে বলে, ‘চাচি দাঁড়াও, there’s always two sides of the story, তোমাদের কথা শুনেছি, শুভর কথাও শুনি।’

মুগ্ধ হন কাজল। কে বলবে এ মেয়ের বয়স মাত্র পনেরো? ছেলে একটু কিছু না পেলেই অস্ত্র হিসেবে কান্নাকে ব্যবহার করে। শুভ কাঁদলে সিরাজ একেবারে গলে যান। কাজল বিরক্ত হন এ হেন ছিঁচকাঁদুনে আচরণে। কিন্তু কৃষ্ণা কী করে এত শান্ত থাকে? আর ও দেশে থেকেও এত নম্র? আবার অন্যায় দেখলে কৃষ্ণা নিজেই রুখে দাঁড়ায়। সে খালি হাতে আত্মরক্ষার সব কৌশল জানে।

কাজল মাঝেমধ্যে লাইলিকে প্রশ্ন করেন, ‘কোন জাদু জানো ভাবি তুমি? কীভাবে বড় করেছ ওকে?’

লাইলি হাসেন কাজলের প্রশ্নে। ‘জাদু জানি না বোন, ওকে শুধু দেখাই কোনটি ঠিক, কোনটি ভুল। বাকিটুকু সে নিজেই করে। আমরা শুধু পথ দেখাই ব্যাস।’

কৃষ্ণা কিছুটা ভাইয়া...সোনা...করে শুভর কান্না থামায়। জানে, শুভ ও কৃষ্ণা পুর মতো পোষা কুকুরছানা চাই। কৃষ্ণার সঙ্গে থাকা টফিকে দেখে লোভ হয়েছে তার।

‘এই শিপ, দাও ওকে ওর টফি কিনে...।’ বলতে বলতে কৃষ্ণা নিজেই বলে, ‘ও, না! হবে না তো!’

‘এইটাই তো বোঝাতে পারছি নারে এই কান্নার সমুদ্রকে। বল না কী করি?’ সিরাজের কণ্ঠে এবার ক্লান্তি।

আসলে অ্যাপার্টমেন্টে, তা–ও বাংলাদেশে। চাইলেও কুকুর রাখাটা মুশকিল, বিশেষ করে যদি ভাড়াবাড়ি হয়। আমেরিকাতেও অনেক বাড়িতে পোষা প্রাণী রাখার অনুমতি নেই। কৃষ্ণা একটু সময় নিয়ে ব্যাপারটা বোঝাল শুভকে।

‘তবে আমার অন্য কিছু চাই।’ নাছোড়বান্দা শুভ।

‘আচ্ছা শিপ, তবে তুমি মাছ কিনে দিয়ো ওকে।’ প্রস্তাব দিল কৃষ্ণা। ‘কীরে শুভ, চলবে তো?’

‘আচ্ছা, আব্বু তোকে একটা নয়, দুটি goldfish কিনে দেবে হুম?’ সম্মতি দিলেন ডা. সিরাজ।

শুভর এখনো চোখে জল, তবে মুখে হাসি।

‘তুই আজ বাঁচালি মা...।’ ইশারায় বলে ফোন কাটলেন কাজল। (চলবে)
–––

ধারাবাহিক এই রচনার আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন