অনলাইন ক্লাস: শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করবেন কীভাবে?

‘শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ আইডি দিয়ে অনলাইন ক্লাসে জয়েন করছে বটে, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে প্রায়ই আমি সন্দিহান থাকি, ওরা আসলেই ক্লাস করছে কি না। কেউ কেউ ক্লাসে জয়েন করে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ডেটা স্বল্পতার কথা বলে ক্যামেরা চালু রাখতেও গড়িমসি করে অনেকে। সব মিলিয়ে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’

কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ শিক্ষক। করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে গত মার্চ মাস থেকেই দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে ধীরে ধীরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরামর্শক্রমে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু হয়েছে। যদিও নানা বাস্তবতায় দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পুরোদমে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে যারাই শুরু করেছেন, তাঁদের মধ্যে কম-বেশি সবার মনেই একই প্রশ্ন, অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করব কীভাবে?
করোনা-বাস্তবতার আগে বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকই অনলাইন ক্লাস নিতে খুব একটা অভ্যস্ত ছিলেন না। যে কারণে অনলাইন ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকে অনেক শিক্ষকই ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবার আগে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম শুরু করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)। গত মার্চ মাস থেকেই অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে দেশের ২৯তম এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই।

বিজ্ঞাপন

আকর্ষণীয়ভাবে ক্লাস শুরু করুন

অনলাইন ক্লাস হোক বা শ্রেণিকক্ষে, ক্লাসের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকৃষ্ট করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, আপনি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখবেন না কি হারিয়ে ফেলবেন, সেটি নির্ভর করে ক্লাসের প্রথম দশ মিনিটের ওপর। অনলাইন ক্লাসে এটির গুরুত্ব আরও বেশি, কেননা শুরুর মিনিট দশেকের মধ্যে যদি আপনি আপনার শিক্ষার্থীদের ক্লাসে সম্পৃক্ত করতে না পারেন, তাহলে ক্লাসের বাকি অংশে সে সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। তাই চেষ্টা করুন ক্লাসের শুরুটা আকর্ষণীয় করতে। বিভিন্ন উপায়ে আপনি আপনার ক্লাসকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন। হতে পারে আপনি যে বিষয়ের ওপর পড়াতে যাচ্ছেন, সেই বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভিডিও দেখিয়ে ক্লাস শুরু করতে পারেন। কিংবা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এমন কোনো প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারেন, শিক্ষার্থীরা যেটি স্বপ্রণোদিত হয়ে উত্তর করবে। মোট কথা ক্লাসের প্রথম দশ মিনিট আকর্ষণীয় করে তুলতে পারলে বাকি অংশেও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত রাখার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

নাম ধরে প্রশ্ন করুন

অনেক সময়ই দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে যোগ দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আপনি হয়তো ভাবছেন অমুক শিক্ষার্থী মন দিয়ে আপনার কথা শুনছে, কিন্তু আদতে হয়তো সে আপনার ক্লাসেই নেই। এই অনিশ্চয়তা দূর করতে শিক্ষার্থীদের নাম ধরে প্রশ্ন করতে পারেন। সেটি হতে পারে লেকচার সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন, কিংবা অন্য কিছু। পুরো ক্লাসে হয়তো আপনি পাঁচজন শিক্ষার্থীকে নাম ধরে প্রশ্ন করলেন। এতে বাকি শিক্ষার্থীরাও সচেতন থাকবে, যেকোনো সময় তাকেও আপনি প্রশ্ন করতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে সম্পৃক্ততা বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

বুদ্ধিদীপ্ত ক্লাস-লেকচার তৈরি করুন

স্বাভাবিক সময়ে অনেক শিক্ষকেরাই প্রতিটি ক্লাস দেড় ঘণ্টা করে নিয়ে থাকেন। করোনাকালে এই নিয়ম থেকে একটু সরে আসার চেষ্টা করুন। মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের সামনে বসে দীর্ঘক্ষণ ক্লাস করে মনোযোগ ধরে রাখা শিক্ষার্থীদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে প্রতিদিন লম্বা সময় ধরে ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। সবকিছু বিবেচনা করে তাই এমনভাবে ক্লাস-লেকচার তৈরি করুন, যেন আপনার শিক্ষার্থীরাও মনোযোগ না হারায়, আবার আপনিও কাঙ্ক্ষিত উপায়ে ক্লাস পরিচালনা করতে পারেন।

দলগত কাজের ওপর গুরুত্ব দিন

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের গ্রুপ ওয়ার্ক বা দলগত কাজ দিয়ে থাকেন। এতে এক দিকে যেমন শিক্ষার্থীদের দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা বাড়ে, তেমনি ক্লাসে সম্পৃক্ততাও নিশ্চিত করা যায়। অনলাইনেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। জুম অ্যাপের মতো বেশির ভাগ ভিডিও কনফারেন্সিং টুলেই ‘ব্রেকআউট রুম’ এর অপশন রয়েছে, যেখানে আপনি শিক্ষার্থীদের কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে দিয়ে আলাদা আলাদা কাজ দিতে পারেন। একটানা লেকচার দেওয়ার বদলে এই কৌশল অবলম্বন করলে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া শুনুন

লেকচার শেষে শিক্ষার্থীদের কাছে সেদিনের ক্লাস সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য ৫-১০ মিনিট সময় বরাদ্দ রাখুন। এতে একই সঙ্গে দুটো কাজ হবে। শিক্ষার্থীরা আপনার লেকচার বুঝতে পারছে কি না সেটি বুঝতে পারবেন, আবার অংশগ্রহণমূলক (Participatory) ক্লাসও নিশ্চিত হবে।

শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নিন

করোনার এই বিভীষিকাময় সময়ে অনেক শিক্ষার্থীই শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই দুর্যোগের সময়ে মানসিকভাবে তাদের পাশে থাকা শিক্ষকদের কর্তব্য। ক্লাস শুরুর আগে তাই নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নিন। তাদের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করুন। শিক্ষক হিসেবে আপনি কীভাবে তাকে সহায়তা করতে পারেন তা জানতে চাইতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে চাঙা হবে এবং ক্লাসেও তুলনামূলক বেশি মনোযোগ দিতে সক্ষম হবে।

*সঞ্জয় বসাক : প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)

মন্তব্য পড়ুন 0